বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও তেলের বাজারে ধস নামার পর থেকেই বিকল্প আয়ের উত্স খুঁজছে তেলনির্ভর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। পর্যটনের ওপর জোর দিচ্ছে তারা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে চলছে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম। বিদেশি ট্যুরিস্টদের কাছে সহজলভ্য ও আকর্ষণীয় করার চেষ্টা চলছে। আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশের মতো সৌদি আরব চিরাচরিত ধর্মীয় বিধিবদ্ধতার বাইরে এসে সিনেমা হল নির্মাণ, বিশেষায়িত বিচ তৈরি, নারীদের বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি চালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বাধীনতা প্রদান, বিদেশি নারী শিল্পীদের কনসার্ট, হলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাণে বিনিয়োগ, ট্যুরিজমের প্রতিবন্ধকতা শিথিল করে দিয়েছে; কয়েক বছর আগে যা ছিল অকল্পনীয়। মধ্যপ্রাচ্যে যে তেলের ভাণ্ডার, তার বড়ো মজুত সৌদি আরবে। সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক, সৌদি আরবে তেলের মজুত রয়েছে প্রায় ২৬৮ বিলিয়ন ব্যারেল। বিশ্বের মোট খনিজ তেলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ মজুত আছে শুধু সৌদি আরবেই। কিন্তু এই বিশাল পরিমাণ তেলের মজুতও ফুরিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী ১০-১৫ বছর পর হয়তো আর তেল বিক্রি করার মতো অবস্থায় থাকবে না সৌদি আরব। তাছাড়া সৌদি আরবের তেলের ওপর নির্ভরতা কমছে গোটা বিশ্বের। ভবিষ্যতে খনিজ তেলমুক্ত বিশ্বে নিজেদের অবস্থান সুসংহত রাখতে তাই সৌদি আরব দুই ট্রিলিয়ন ডলারের একটি সার্বভৌম তহবিল গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় সৌদি আরবের আয় অর্ধেক কমে গেছে। ফলে তাদের এখন অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে নতুন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে। সৌদি আরবের আয়ের ৯০ শতাংশ আসে তেল বিক্রি থেকে। সৌদি সরকার ‘ভিশন ২০৩০’ নামে এক মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে দুই বছর আগে। এর পেছনে আছেন ৩৩ বছর বয়সি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। মোটা বেতনে গাদা গাদা বিদেশি কনসালট্যান্ট নিয়োগ করে তৈরি করা হয়েছে মহাপরিকল্পনা। সৌদি তেলমন্ত্রী খালিদ আল ফালিহ বলেন, আমাদের লোকজন ভালো করেই জানেন যে একদিন তেলের কূপগুলো শুকিয়ে যাবে। আর হয়তো তারও অনেক আগে ইলেকট্রিক কারের ব্যাপক প্রচলন ঘটবে। ফলে তেলের চাহিদা কমবে। এজন্য ভিশন ২০৩০-এর লক্ষ্য অর্জন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। জেনারেল এন্টারটেইনমেন্ট অথরিটির প্রধান আহমেদ আল খতিব বলেন, বিনোদন নিতে সৌদি আরবের লোকজন বিদেশে গিয়ে প্রচুর অর্থ খরচ করে, সেটা বন্ধ করতে সৌদি সরকার গঠন করেছে ‘জেনারেল এন্টারটেইনমেন্ট অথরিটি’। এই সংস্থা কিছু কিছু বিনোদনের অনুমতি দিচ্ছে। আর্ট ফেস্টিভাল থেকে লাইট শো, এমনকি মিউজিক কনসার্টেরও অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
বিবিসি, রয়টার্স, আরব নিউজ, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টেলিগ্রাফ, খালিজ টাইমস ও ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনগুলো থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী আঞ্চলিক রাজনীতিতে মোড়লগিরি করতে গিয়ে সৌদি আরব বড়ো রকমের অর্থ খরচ করছে। ইয়েমেনের সঙ্গে যুদ্ধ, অস্ত্র ক্রয় প্রতিযোগিতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সৌদি আরবের জিডিপি পরিস্থিতির ক্রমাবনতি ঘটছে। দেশটির জনসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না আয়। দেশটির মোট জনসংখ্যা বছরের ব্যবধানে ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সোয়া ৩ কোটি। তবে মাথাপিছু বার্ষিক আয় কমেছে ১৫ শতাংশের বেশি। তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে সৌদি আরবের জনসংখ্যা দেড় গুণ বেড়েছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে সরতে চাচ্ছে সৌদি আরব। অর্থনীতি বহুমুখী করার মাধ্যমে আগামী বছর, অর্থাত্ ২০২০ সালের মধ্যে তেল বিক্রির ওপর নির্ভরশীলতার অবসান ঘটাতে চায় দেশটি। তেল ও গ্যাসের পর সৌদির অন্যতম আয়ের উত্স হলো হজ ও ওমরাহ খাত। প্রতিবছর হজ পালনের জন্য ২০-২৫ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান মক্কায় যান। ২০২০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে ২৭ লাখ হবে বলে আশা করছে সরকার। জাতীয় পর্যটন কমিটির সদস্য আবদুল ঘানি আল আনসারি অর্থনীতিতে ধর্মীয় খাতের অবদান বাড়াতে একে পুনর্বিন্যস্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি জিডিপিতে (মোট দেশজ উত্পাদন) পর্যটন খাতের অবদান তিন বছর আগে ২২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার থাকলেও তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে হজ ও ওমরাহর মাধ্যমে আসছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার।
আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে প্রায় ৬ কোটি মানুষ ওমরাহ পালন করেন। অর্থনীতিবিদ আবদুল্লাহ কাতিব বলেন, হজ মৌসুম থেকে বার্ষিক আয় হয় ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন থেকে ৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। হজ ও ওমরাহ থেকে যে আয় হয়, সেই আয়ের ৪০ শতাংশ আসে হজ পালনকারীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে। হজ পালনকারীরা যে উপহার কেনেন, তার মাধ্যমে আসে ১৫ শতাংশ আর খাদ্য ও অন্যান্য সেবা প্রদানের মাধ্যমে হয় ১০ শতাংশ আয়। মক্কা চেম্বার অব কমার্সের তথ্যমতে, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসল্লিদের হজ পালন করতে খরচ পড়ে গড়ে ৪ হাজার ৬০০ ডলার। সৌদি নাগরিকদের খরচ পড়ে দেড় হাজার ডলার। ইরানি নাগরিকদের হজ পালনে খরচ পড়ে সাড়ে ৩ হাজার ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, দেশটির বাজেট ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ বিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা কমছে। ফলে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে সৌদি আরবের সরে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
বিবিসি বলছে, সম্প্রতি দেশটি বড় ধরনের সংস্কারের যে ঘোষণা দিয়েছে, তারই অংশ হিসেবে দেশটি হজ ও ‘ধর্মীয় পর্যটন’ ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাচ্ছে। ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী শহরের মধ্যে যাতায়াতব্যবস্থার উন্নতি এবং শিল্প-সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন নতুন স্থাপনা নির্মাণ চলছে। এসব পরিকল্পনা দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দেশটির সংস্কৃতি ও পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন হজ বা ওমরাহকারীরা মক্কা ও মদিনার বাইরে সফর করতে পারবেন এবং হজযাত্রীরা চাইলেই তাদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে পারেন। মক্কা, মদিনা, জেদ্দা ও অন্যান্য বড়ো শহরকে সংযুক্তকারী রেললাইন নির্মাণ, নতুন জেদ্দা বিমানবন্দর এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের শিলা দিয়ে বানানো উন্মুক্ত জাদুঘর করা হয়েছে। এছাড়া ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয় কিন্তু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসম্পন্ন শহর ও স্থাপনা ভ্রমণে উত্সাহিত করা হচ্ছে হাজিদের।