গতকাল ইত্তেফাক অনলাইনে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম ছিল : 'উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে পাঠানো হয় যুদ্ধে, ৩০ বাংলাদেশির ২০ জনই নিহত'। ইহার মধ্যে ১৭ জনই যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রথম দিনেই মৃত্যুবরণ করিয়াছেন দুঃখজনকভাবে। এই খবরটি আমাদের বিচলিত ও ব্যথিত করিয়াছে। ইতিমধ্যে এমন চক্রের সহিত জড়িত কয়েক জনকে গ্রেফতার করিয়াছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি । তবে এই ধরনের খবর যে নূতন তাহা নহে । গত প্রায় এক বৎসর ধরিয়া এমন উদ্বেগজনক খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রচারিত হইতেছে বটে; কিন্তু রাশিয়ায় পাড়ি জমানো বাংলাদেশের এই সকল হতভাগ্য ও বেকারগ্রস্ত তরুণদের প্রতারণার হাত হইতে রক্ষা করা হইতেছে না । জানা যায়, বাংলাদেশি যুবকদের প্রথমে এস্তোনিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের দেশে উচ্চ বেতনে চাকুরি দেওয়ার কথা বলিয়া পরে রাশিয়ায় ঠেলিয়া দেওয়া হইতেছে। অতঃপর নানা কৌশলে তাহাদের জড়ানো হইতেছে ইউক্রেন যুদ্ধে। ইউক্রেন যুদ্ধ যতই দীর্ঘায়িত হইতেছে, ততই রাশিয়ায় দেখা দিতেছে সৈন্যসংকট। এই সংকট মিটাইতে উত্তর কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশ সরাসরি সৈন্য দিয়া সহযোগিতা করিতেছে। আর বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের তরুণদের আসলে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ব্যবহার করা হইতেছে ‘মানব-ঢাল’ কিংবা প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করিবার বলির পাঁঠা হিসাবে । মানবতার ইতিহাসে চরম ধিক্কারজনক এমন প্রবঞ্চনার আমরা নিন্দা জানাই ।
এইখানে যে ৩০ বাংলাদেশির কথা বলা হইতেছে, তাহাদের প্রথমে রাশিয়ার নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়; কিন্তু সেইখানে পৌঁছানোর পর তাহাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কাড়িয়া লইয়া তাহাদের সেনাবাহিনীর নিকট সোপর্দ করা হয়। পরে ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাহাদের নামানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম সারিতে । এই সকল নিরপরাধ মানুষ না জানেন যুদ্ধকৌশল, না বুঝেন আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম । ফলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা ড্রোনের নিশানায় পড়িয়া মুহূর্তেই নিভিয়া যাইতেছে তাহাদের প্রাণপ্রদীপ। যুদ্ধক্ষেত্রের এই মর্মান্তিক দৃশ্য কেবল বর্বরতাই নহে, ইহা আধুনিক মানব পাচারের এক ভয়াবহ রূপকে উন্মোচিত করিয়া তুলিয়াছে। এই আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রকে এখনই প্রতিহত করিতে হইবে । অবিলম্বে এই ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক । যেই সকল ট্রাভেল এজেন্সি বা প্রতিষ্ঠান লোভনীয় বিজ্ঞাপন ও মিথ্যার বেড়াজালে এই দেশের যুবকদের প্রবাসে মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া দিতেছে, তাহাদের দ্রুত চিহ্নিত করিয়া আইনের আওতায় আনিতে হইবে এবং যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করিতে হইবে । কেবল কয়েকটি মূল হোতাকে গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নহে, আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা (ইন্টারপোল) ও সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের সহিত সমন্বয় সাধন করিয়া আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের শিকড় সমূলে উৎপাটিত করাও একান্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, ভাষাগত সমস্যার কারণে অনেকে চুক্তিপত্র ঠিকমতো পড়িতে ও বুঝিতে পারে না । ইহারই সুযোগে তাহাদের রণক্ষেত্রে শিকার হিসাবে ব্যবহার করা হইতেছে। এখন এই সকল ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা, সেইখানে তাহাদের বৈধ ও নিরাপদ কাজের ব্যবস্থা করা কিংবা দেশে ফিরাইয়া আনা সরকারের জরুরি কর্তব্য হইয়া পড়িয়াছে। অর্থাভাবে যাহাদের মরদেহ দেশে ফিরাইয়া আনা যাইতেছে না, তাহাদের লাশ দেশে আনিতেও সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা প্রয়োজন । একই সঙ্গে আমাদের সাধারণ নাগরিকদেরও এই ব্যাপারে সজাগ ও সচেতন হইতে হইবে। রাতারাতি ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্নে অন্ধ না হইয়া বিদেশে যাত্রার পূর্বে সরকারি বৈধ এজেন্সি, ভিসা এবং চাকুরির শর্তাবলি যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা আবশ্যক।
অধিক বেতনের মোহে অজ্ঞাত কিংবা সন্দেহজনক কোনো প্রতিষ্ঠানের হস্তে নিজের জীবন সমর্পণ করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হইতে পারে না। বিদেশে আমাদের শ্রমশক্তি রপ্তানির প্রয়োজনীয়তাকে আমরা অস্বীকার করি না। আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণভোমরা রেমিট্যান্স খাত; কিন্তু আমাদের যুবক-যুবতিরা বিদেশে গিয়া প্রতারণার শিকার হউক কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে পড়ুক, তাহা আমরা মোটেও কামনা করিতে পারি না । তাই এই ব্যাপারে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলিকে আরো সজাগ ও দায়িত্বশীল হইতে হইবে ।