পৃথিবীতে কত বৈচিত্র্যপূর্ণ, অবিশ্বাস্য ঘটনাই-না ঘটে! এমনি | এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কারাগারে । ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। সময় সন্ধ্যা ৭.২৭ । আমেরিকার টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিল শহরের একটি সংশোধনাগার, আমরা যাকে জেলখানা বা কারাগার বলি । সেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার একটি কক্ষ । সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে ৫০ বছর বয়সের এক ভারি মিষ্টি চেহারার নারীকে, নাম ক্রিস্টা পাইক। তার শরীরে উচ্চ মাত্রার চেতনানাশক পেনটোবারবিটাল প্রয়োগ করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হবে। তার অপরাধ, তিনি ১৯৯৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে কলিন শ্লেমার নামে তারই এক সহপাঠীকে হত্যা করেছিলেন। সেই বয়সে সে মনে করেছিল, তার শিপ নামের বয়ফ্রেন্ডকে শ্লেমার ভাগিয়ে নিচ্ছে । ১৯৯৬ সালে বিচারিক আদালত ক্রিস্টার মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় । এরপর গত তিন দশক ধরে আইনি লড়াইয়ে সব আদালতই তার মৃত্যুদণ্ডের রায়ই বহাল রেখেছিল। এ পর্যন্ত সবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বাকি কাহিনি বিস্ময়কর।
টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ২০০ বছরে এই প্রথম কোনো নারীকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। স্বভাবতই সবার নজর ওই মৃত্যুদণ্ডের দিকে। কক্ষের সামনে একটি পর্দা দেওয়া। সেখানে বসে আছেন পাইকের আইনজীবী, তার অধ্যাত্মিক কাউন্সিলর এবং গণমাধ্যমের কয়েক জন কর্মী । আর আছেন হত্যার শিকার শ্লেমারের মা। তিনি প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ফ্লোরিডা থেকে এসেছেন ৩০ বছর আগে তার মেয়ের হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দেখতে। সবাই দর্শকের মতো আসন নিয়ে বসেছেন। পর্দাটি সরালেই তারা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দেখতে পাবেন ।
প্রায় ১০ মিনিট পর সন্ধ্যা ৭.৩৭ মিনিটে প্রথম অত্যন্ত শক্তিশালী চেতনানাশক ড্রাগ পেন্টোবারবিটাল প্রয়োগ করা হলো পাইকের শরীরে । এরপর পর্দা নামিয়ে দেওয়া হয়। এর মাত্র কয়েক মিনিট পর আবার পর্দা তোলা হয় । কারণ ক্রিষ্টা পাইক মরেনি! গোঙানোর শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল । আবার তাকে ঐ শক্তিশালী ড্রাগ দেওয়া হয় । কিন্তু কী আশ্চর্য, ৭.৫৬ মিনিটে দ্বিতীয় বার পেন্টোবারবিটাল প্রয়োগের পরও উপস্থিত সবাই দেখতে পান, ক্রিষ্টা মাথাটা একদিক থেকে আরেক দিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে। এই শক্তিশালী চেতনানাশক এক ডোজ কোনো শক্তিশালী পুরুষকে দিলে মুহূর্তেই জীবন নাশ হয়ে যায়, কিন্তু এই নারী মরল না। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন চেতনানাশক প্রয়োগে মৃত্যু না হওয়ার ঘটনা এই প্রথম ।
ঘটনার পর গোটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে শোরগোল পড়ে যায় । ক্রিস্টার আইনজীবী দাবি করেন, যেহেতু তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায়নি এবং সংবিধান অনুসারে কাউকে শারীরিকভাবে প্রচণ্ড কষ্ট দেওয়ার অধিকার নেই, তাই তাকে আর মৃতুদণ্ড না দিতে। টেনেসির গভর্নর নির্দেশ দেন, এ বছর আর তাকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি না করতে । সেই সঙ্গে তিনি আদেশ দিয়েছেন, অপেক্ষায় থাকা অন্য কাউকেও তার রাজ্যে আপাতত ডিসেম্বর পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড না দিতে। এ অস্বাভাবিক ঘটনায় সংশোধনাগারের প্রধান ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন । একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন—বিশ্বব্যাপী ধারণা আছে, কোনো ব্যক্তিকে সময়মতো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা না গেলে, অথবা মত্যু নিশ্চিত না হলে সে প্রাণে বেঁচে যায়, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড মওকুফ হয়ে যায় । এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। কোথাও এমন আইন আছে বলে খুঁজে পাইনি। অবশ্য পূর্বের রাজা-বাদশা এবং বর্তমানে রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি মওকুফ করতে পারেন যে কোনো অবস্থায় । অবশ্য আমাদের দেশে যেভাবে ফাঁসি দেওয়া হয় তাতে বেঁচে ওঠার কোনো সুযোগ নাই। যে রশি দিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয় তার নাম ম্যানিলা রোপ। এই বিশেষ দড়িতে ফাঁসির কয়েক দিন আগে থেকেই সবরি কলা ও ঘি মাখানো হয়। ফাঁসি কার্যকর করার পর দশ মিনিট বা তারও বেশি সময় ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং একজন ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন । যাহোক, অন্য গল্পে চলে গেলাম । পাইকের কাহিনিতে ফিরে আসি ।
কয়েক দিন অচেতন ও অসুস্থ থাকার পর ক্রিস্টার জ্ঞান ফিরেছে এবং সে এখন অসুস্থতার জন্য চিকিৎসা গ্রহণ করছে । প্রশ্ন হলো, তাকে কি আবার কবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে এবং সেটা কী উপায়ে? যুক্তরাষ্ট্রের সংশোধনাগার বা কারাগার, মেডিক্যাল টিম, পুলিশ এবং জনগণের মধ্যে ক্রিস্টার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে দ্বিমত তৈরি হয়েছে তলে তলে । যদিও তাতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না । কেউ কেউ মনে করছেন, ৩০ বছর আগে সদ্য ১৮ বছরে পা দেওয়াএকটি মেয়ে খুন করে গুরুতর অপরাধ করেছে। কিন্তু সে ৩০ বছর ধরে জেলে আছে এবং তাকে জেলখানাতেই কাটাতে হবে। তাহলে এত তাড়া কেন?
ক্রিস্টা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৬ সালে, ভার্জিনিয়ায় । মা এবং বাবা দুজনই ছিলেন মদ্যপ। এক পর্যায়ে পিতা-মাতার মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। ১১ বছর বয়সে এই মেয়েটি তার মায়ের বয়ফ্রেন্ডের দ্বারা ধর্ষিত হয়। ১২ বছর বয়সে সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে এবং তাকে এভালুয়েশন সেন্টারে পাঠানো হয়। ১৭ বছর বয়সে সে আবার ধর্ষণের শিকার হয়। এবং ১৮ বছর বয়সে নিজেই এই গুরুতর অপরাধটি করে ফেলে ।
এখন মূল কথা আসি । একটি শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা কতটা প্রয়োজন তা এই ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে আছে। আমাদের এই সমাজে স্বাভাবিক শিক্ষা নাই, স্বাস্থ্যনিশ্চয়তা, সুষম খাদ্যের নিশ্চয়তা নাই, বহু পিতা-মাতার আচরণ মোটেই স্বাভাবিক নয় । এই অবস্থায় দেশটিতে প্রতিদিন ৯ হাজার ৪০০ শিশু জন্মগ্রহণ করছে। ঠিকই পড়েছেন, ৯ হাজার ৪০০! এর একটি বড় অংশ আবার শিশুর জন্ম দিয়ে কোনো দায়ত্ব পালন করছেন না। এমনকি হাঁটা শিখলেই রাস্তায় ছেড়ে দিচ্ছে হয় ভিক্ষা করতে, অথবা গ্যারেজে, কিংবা হোটেলে কাজ করতে। মেয়েশিশু হলে বাসাবাড়িতে। এই শিশুদের জীবন প্রতি মুহূর্তে ধর্ষিত হওয়ার মতো জীবন। অর্থাৎ জাতির মানসিক স্বাস্থ্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে তা কল্পনা করাও কষ্ট। ক্রিস্টা পাইকের মতো দুর্ভাগা জীবনের ঘটনা বাংলাদেশে অসংখ্য, অগণিত। আমাদের এই সমাজকে স্বাভাবিক করতে হলে পাহাড় ঠেলে সরাতে হবে। গত ৫৫ বছরে সে দায়িত্ব যাদের নেওয়ার কথা ছিল এবং আছে, তারা প্রায় সবাই নিজেদের আখের গুছিয়ে, নিজেদের পরিবার সন্তানকে নিরাপদ করে নিরাপদ দূরত্বে পাঠিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশে রয়ে রয়ে যাচ্ছে খুন, ধর্ষণ, বলাৎকার এবং অস্বাভাবিক সব ঘটনা । মনে পড়ে নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতা, ‘ইতরের দেশে’। আমি একটি ইতরের দেশে থাকি.... আমার ভাগ্য আমি নিজের হাতেই ভেঙেছি/ তাই বাতিল স্টিমরোলারদের কাছে বসে থাকি,/ বসে থাকি আর, নতুন কাল্পনিক রাস্তা বানাবার গল্প শুনি ।
লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক
