শিক্ষক হলেন সভ্যতার স্থপতি, জ্ঞানের প্রদীপ । এবং মানবিক মূল্যবোধের চিরন্তন বাহক। শিক্ষকদের অবদান স্মরণ ও সম্মান জানানোর জন্য প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। মূল লক্ষ্য শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা, নীতি-সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে বৈশ্বিক সচেতনতা সৃষ্টি করা শিক্ষককে কেবল একটি পেশার সঙ্গে যুক্ত কর্মী হিসেবে দেখলে শিক্ষার প্রকৃত তাৎপর্যই খর্ব হয়। শিক্ষক একই সঙ্গে জ্ঞানদাতা, পথপ্রদর্শক, মূল্যবোধের নির্মাতা, সামাজিক পরিবর্তনের সহযাত্রী এবং ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির কারিগর। ২০২৬ সালের 'World Teachers Day' সুপারিশে বলা হয়েছিল শিক্ষকের মর্যাদা শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত এবং শিক্ষকতার পেশার প্রতি যথাযথ সামাজিক সম্মান থাকা শিক্ষা-লক্ষ্য অর্জনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শিক্ষকতাকে বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন একটি পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়।
আজকের বিশ্বের শিক্ষা-সংকটের অন্যতম বড় দিক হলো যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি। ইউনেসকোর Global Report on Teachers অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বে আনুমানিক ৪ কোটি ৪০ লাখ অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে সাব- সাহারান আফ্রিকাতেই প্রয়োজন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ শিক্ষক। এই সংকট শুধু শিক্ষকের সংখ্যা কম থাকার বিষয় নয়। কোথাও শিক্ষক নিয়োগ করা কঠিন, কোথাও শিক্ষক ধরে রাখা কঠিন, কোথাও আবার শিক্ষকদের অতিরিক্ত কর্মভার ও দুর্বল কর্মপরিবেশ পেশাটিকে কম আকর্ষণীয় করে তুলছে। ফলে শিক্ষক-সংকটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শিক্ষকতার পেশায় প্রবেশের আগ্রহ কমে যাওয়া এবং পেশা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা।
শিক্ষক-সংকটকে কেবল সংখ্যার সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না। যোগ্য, প্রশিক্ষিত, অনুপ্রাণিত এবং যথাযথভাবে সহায়তাপ্রাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকলেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয় না; শিক্ষকের জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, পেশাগত স্বাধীনতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, মানসিক স্বস্তি এবং শিক্ষার্থীর প্রতি পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার সুযোগও প্রয়োজন। উল্লেখ্য, 'শিক্ষকের মর্যাদা' বলতে অনেক সময় শুধু বেতন-ভাতা বোঝানো হয়। কিন্তু বিষয়টি তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত।
বাংলাদেশে শিক্ষকসংকট ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাবে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকসংকট দ্রুত দূর করার পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগে জোর দিতে হবে। সরকারি কলেজে ২৫ শতাংশ পদে শিক্ষক নেই। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষকসংকট। সব স্তরেই রয়েছে শিক্ষকসংকট। কোথাও প্রধান শিক্ষক নেই। কোথাও আবার অনুমোদিত পদের অর্ধেকই শূন্য। এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে, যেখানে মাত্র এক জন শিক্ষককেই একাধিক বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৩৮ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। মামলা-জটিলতার কারণে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে অনেক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্যমতে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে ৩ হাজারের কিছু বেশি পদ শূন্য। সবচেয়ে বেশি সংকট বিজ্ঞান, গণিত এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে। ফলে এসব বিষয়ে অন্য বিষয়ের শিক্ষককে ক্লাস নিতে হচ্ছে । কোথাও ইসলাম শিক্ষা, কোথাও কৃষি শিক্ষা কিংবা অন্য বিষয়ের শিক্ষককে বিজ্ঞান, গণিত বা আইসিটির ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি বাড়ছে।
গত এপ্রিলে শিক্ষামন্ত্রী সংসদে জানান সরকারি কলেজে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত প্রভাষক পদের শূন্যসংখ্যা ৬৫৬টি। আর সদ্য সরকারি করা কলেজে নন-ক্যাডার প্রভাষক পদের শূন্য সংখ্যা ২ হাজার ৪১০। সরকারি কলেজে শিক্ষকসংকট কমাতে বিশেষ শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার উদ্যোগ নেয় সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। গত বছরের নভেম্বর ৪৯তম বিসিএসে ৬৬৭ জনকে চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়। মাত্র তিন মাসে এ নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। তবে পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে অন্তত ১০ মাস ধরে এসব চাকরিপ্রার্থীর গেজেট প্রকাশ আটকা ছিল। সম্প্রতি এ গেজেট জারি করা হলেও নানান বিতর্কে যোগদানে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে সমাজে শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাথাকলেও যদি কর্মপরিবেশ অনুকূল না হয়, তাহলে সেই সামাজিক সম্মান বাস্তব জীবনে যথেষ্ট প্রভাব ফেলবে না। তাই শিক্ষক মর্যাদা উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সামাজিক সম্মান ও বাস্তব পেশাগত সুবিধার সমন্বয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি শিক্ষকবৃন্দ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI শিক্ষার ধারণাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এখন কয়েক সেকেন্ডে তথ্য, ব্যাখ্যা, অনুবাদ, সারাংশ ও বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাসামগ্রী পেতে পারে। এতে শিক্ষকের ভূমিকা শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা যথার্থ নয়। বরং শিক্ষকের ভূমিকার ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে।
তথ্য সরবরাহের পাশাপাশি শিক্ষককে এখন শিক্ষার্থীকে তথ্য যাচাই করতে শেখাতে হবে। কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর, কীভাবে উৎস যাচাই করতে হয়, কীভাবে যুক্তি তৈরি করতে হয় এবং প্রযুক্তি কীভাবে নৈতিকভাবে ব্যবহার করতে হয়—এসব দক্ষতা ভবিষ্যতের শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
AI শিক্ষকের বিকল্প হওয়ার চেয়ে শিক্ষককে সহায়তা করার একটি শক্তিশালী উপকরণ হতে পারে । কিন্তু প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে শিক্ষককে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ করে তুলতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে AI literacy, ডিজিটাল প্রযুক্তি, তথ্যের সত্যতা যাচাই, সাইবার নিরাপত্তা ও নৈতিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয় যুক্ত করা প্রয়োজন । অর্থাৎ প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, শিক্ষককে তত বেশি মানবিক, সৃজনশীল ও চিন্তাশীল শিক্ষার নেতৃত্ব দিতে হবে।
একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা কোনো শিশুকে তার আর্থিক অবস্থা, প্রতিবন্ধিতা, ভাষা, সামাজিক পরিচয় কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পিছিয়ে রাখতে পারে না। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষকের ভূমিকা অপরিহার্য। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, অভিবাসী ও বাস্তুচ্যুত শিশু, দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থী—সবার প্রয়োজন এক নয়। শিক্ষককে তাই শিক্ষার্থীর বৈচিত্র্য বুঝে পাঠদান পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে।
এই কাজের জন্য প্রয়োজন শিশু মনোবিজ্ঞান, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক-আবেগিক শিক্ষা এবং বৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ। দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির সঙ্গে শিক্ষার মান সরাসরি সম্পর্কিত। শহর ও গ্রামের শিক্ষা-সুযোগের পার্থক্য, প্রযুক্তিগত বৈষম্য, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের চাপ, অবকাঠামো এবং শিক্ষার মান—এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
শিক্ষকতার পেশাকে শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন । যেমন শিক্ষকদের যথাযথ পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা, কর্মপরিবেশ উন্নত করা, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা। অধিকন্তু শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিক্ষক-সংকট মোকাবিলায় শুধু শূন্য পদ পূরণ করলেই হবে না; ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীসংখ্যা, অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক-প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো—শিক্ষককে শক্তিশালী না করে শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা যায় না। নতুন পাঠ্যক্রম, নতুন প্রযুক্তি, নতুন অবকাঠামো কিংবা নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি— সবকিছুর বাস্তব রূপ দেন শিক্ষক। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার SDG 4-এর উদ্দেশ্য হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য আজীবন শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। এই লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষকই অন্যতম প্রধান বাস্তব শক্তি ।
ষাট বছর আগে ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক সুপারিশ শিক্ষককে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রীয় পেশাজীবী হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার যে নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছিল, বর্তমান সময়ে সেই অঙ্গীকারকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি। আজকের শিক্ষককে একদিকে যেমন শ্রেণিকক্ষে জ্ঞান দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে তাকে ডিজিটাল পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ুসংকট, সামাজিক বৈচিত্র্য, বৈষম্য ও দ্রুত পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে হচ্ছে। এই বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালনের জন্য শিক্ষককে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক সম্মান দিতে হবে। একজন শিক্ষক শুধু একটি শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা করেন না; তিনি বহু প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও স্বপ্নকে প্রভাবিত করেন। শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারই হতে পারে আগামী প্রজন্মের জন্য আরো ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, জ্ঞাননির্ভর ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবী নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি ।
• লেখক : ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক