বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস আজ

হাত ধোয়া আমাদের জীবনে মরা-বাঁচার সঙ্গে জড়িত

শুধু ভালোভাবে হাত ধুয়েই কমপক্ষে ২০ ধরনের অসুস্থতা থেকে বাঁচা যায়। হাত ধোয়ার অভ্যাস রপ্ত করে আমরা মানব ইতিহাসের মহামারি কলেরা ও ডায়রিয়াকে বাগে আনতে পেরেছি। তবে পৃথিবীতে করোনা সংক্রমণের পর থেকে হাত ধোয়া আমাদের জীবনে মরা-বাঁচার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে—খাবার গ্রহণের আগে ভালোভাবে সাবান বা অন্য যে কোনো জীবাণুনাশক দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করতে হয়। তবে ভালোভাবে হাত ধোয়ার বিষয়টি জানলেও অনেকে তা গুরুত্ব দিতে চান না। অথচ হাত পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে, সহজেই সুস্থভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব। আমাদের অনেক রোগই নিরাপদ পানি এবং সাবান দিয়ে হাত না ধোয়ার কারণে হয়ে থাকে।

বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘হাত পরিষ্কার রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস। সাধারণত হাত নোংরা হলে আমরা হাত ধুই, খাবার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর। আবার প্রাত্যহিক জীবনে অনেক সময় অভ্যাসের বশেও হাত ধুই। শুধু ভালোভাবে হাত ধুয়েই কমপক্ষে ২০ ধরনের অসুস্থতা থেকে বাঁচা যায়। হাত ধোয়ার অভ্যাস রপ্ত করে আমরা মানব ইতিহাসের মহামারি কলেরা ও ডায়রিয়াকে বাগে এনেছি। তবে পৃথিবীতে করোনা সংক্রমণের পর থেকে হাত ধোয়া আমাদের জীবনে মরা-বাঁচার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ২০১৯-২০ সালে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ সারা পৃথিবীর মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছে হাত ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করা কতটা জরুরি।’

বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক বলেন, অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় নাকমুখে হাত দেওয়া বা হাত ভালোভাবে না ধুয়ে খাবার খেলে বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। ফলে সাধারণ ঠাণ্ডা বা ফ্লু থেকে শুরু করে ডায়রিয়া, জন্ডিস, আমাশয়, টাইফয়েড ও কৃমির মতো রোগসহ বিভিন্ন পানি ও খাদ্যবাহিত রোগে মানুষ আক্রান্ত হয়। অনেকেই আবার হাঁচি, কাশি ইত্যাদি অপরিষ্কার জামা বা রুমালে মোছেন। এসবের মাধ্যমে এমনকি করমর্দনের মাধ্যমেও রোগ ছড়াতে পারে।

তিনি বলেন, শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন রোগ-জীবাণু সংক্রমণের হার আরও বেশি। পাঁচ বয়সের কম বয়সি শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া এবং ডায়রিয়া, যা মূলত পানিবাহিত রোগ। এছাড়া শিশুকে খাওয়ানোর আগে হাত ধোয়ার অভ্যাস করালে রোগ সংক্রমণের হার কমে এবং তাদের মৃত্যু হারও সহজেই কমানো যায়। সঠিক হ্যান্ড ওয়াশিং পদ্ধতিতে ৮০ শতাংশ রোগ ঠেকানো যায় বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া উভয় প্রবণতা কমাতে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিছু নির্দিষ্ট সময়—বিশেষ করে খাবার খওয়ার আগে, খাবার তৈরির আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে দুই হাত ধোয়া হলে, ডায়রিয়ার হার ৪০ শতাংশের বেশি ও তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের হার প্রায় ২৩ শতাংশ কমানো সম্ভব।

তবে শুধু পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করলে তাতে জীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। ফলে হাত ধুতে হবে ক্ষারযুক্ত সাবান, তরল সাবান বা অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে। এতে করে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু ধ্বংস কার্যকরভাবে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করার অভ্যাস যে কোনো মহামারি বা রোগের প্রাদুর্ভাব রোধে, কিংবা নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। 

শিশুদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য বলছে—বিশ্বে বছরে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন শিশু বা প্রতি চার জনে একজন শিশু ডায়রিয়া এবং নিউমোনিয়ায় মারা যায়। নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে বছরে প্রায় ১০ লাখ ডায়রিয়াজনিত মৃত্যু এবং প্রায় ১৬ শতাংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের সংক্রমণজনিত রোগের ঝুঁকি কমানো যায়।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, হাত দিয়ে বিপুল সংখ্যক জীবাণু আমাদের নাকমুখে এবং খাবারের সঙ্গে মিলে শরীরে প্রবেশ করে। হাত ধোয়াটা যখন পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে মিলে যায়, তখন এটি খুবি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি হাতটা সাবান দিয়ে ধুয়ে আবার ওয়াসার পানিতে হাত ভেজানো হয় তাহলে হাত ধুয়ে কোনো লাভ হবে না। এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, হাত ধোয়ার স্বাস্থ্যগত বিষয়টিকে সামনে আনা দরকার। এখনো গ্রাম-অঞ্চলে বসবাসকারী কিছু মানুষ হাত ধোয়ার জন্য কী কী ব্যবহার করা যেতে পারে; সেই জ্ঞানটাও তাদের দিতে হবে। এছাড়া শিশুদের নিউমোনিয়া প্রতিরোধে হাত ধোয়া একটা বড় ভূমিকা পালন করে। আমরা চাইব, হাত ধোয়ার বিষয়টিকে প্রারম্ভিক শিক্ষা যেমন—স্কুল-মাদ্রাসা যেখানে শিক্ষা জীবন শুরু হয়, সেখানে নিশ্চিত করতে। জীবনযাপনের সঙ্গে স্বাস্থ্যগত বিষয়টা এখান থেকে শুরু হতে পারে। হাত ধোয়া দিবস পালন করা হচ্ছে, এটা অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। আরও গ্রহণযোগ্য হয় যদি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধানটাকে পরিপূর্ণভাবে এতে যুক্ত করা হয়।   

আজ ১৫ অক্টোবর বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস। বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বাড়াতে এই দিবস পালন করা হয়। এই দিবসের সূচনা হয়েছিল ২০০৮ সালে। জনসাধারণের মধ্যে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার মাধ্যমে রোগের বিস্তার রোধ করার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতেই পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। প্রতি বছর ২০ কোটিরও বেশি মানুষ গ্লোবাল হ্যান্ড ওয়াশিং ডে উদযাপন করে। বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘বি হ্যান্ড ওয়াশিং হিরো’, যার বাংলা করা হয়েছে—হাত ধোয়ার নায়ক হো।

সঠিক নিয়মে হাত ধোয়া
কলের পানি ছেড়ে দিয়ে চলমান অবস্থায় দুই হাত ধুতে হবে। যে কোনো সাবান দুই হাতে লাগিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড সময় ধরে হাতের সামনে ও পেছন ভাগ, আঙুলের ফাঁকে, নখে ও কবজিতে ভালোভাবে ঘষতে হবে। এর পর প্রবহমান পানি দিয়ে পুরো হাত ভালোভাবে কচলে আবার পানি ঢেলে দিলেই পরিষ্কার হবে। হাত দুটি কলের পানির নিচে ধরলেই পানি নিচে পড়বে। বেসিনের ট্যাপেও এভাবেই পরিষ্কার করা যায়। সাবানের বদলে অনেক এন্টিসেপটিক জাতীয় তরল পদার্থ ব্যবহার করা যায়। আবার অনেকে শুধু হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করেন, সেটিও একটি ভালো বিকল্প।