বেশির ভাগ সময় সন্তান না হওয়ার জন্য আমাদের সমাজ নারীকেই দোষারোপ করে। অথচ বিশ্বজুড়ে প্রজনন সমস্যায় ভোগা দম্পতিদের প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই পুরুষের কোনো না কোনো সমস্যা দায়ী থাকে। বাস্তবে বন্ধ্যত্ব বা ইনফার্টিলিটি নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমান হতে পারে। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
পুরুষের বন্ধ্যত্ব কী
কোনো দম্পতি যদি নিয়মিত যৌন সম্পর্কের পরও এক বছরের মধ্যে সন্তান ধারণে ব্যর্থ হন, তখন তাকে বন্ধ্যত্ব বলা হয়। পুরুষের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা, গঠন বা চলাচলের ত্রুটির কারণে গর্ভধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় যৌনসক্ষমতা স্বাভাবিক থাকলেও পুরুষ বন্ধ্যত্বে আক্রান্ত হতে পারেন।
সাধারণত সন্তান ধারণে ব্যর্থ হওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই এটি ধরা পড়ে। তবে কিছু ক্ষেত্রে শরীর আগেভাগেই ইঙ্গিত দেয়। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি:
১. যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া
২. উত্থানের সমস্যা
৩. বীর্যপাতের সমস্যা
৪. অণ্ডকোষে ব্যথা বা ফোলা ভাব
৫. শরীরে হরমোনজনিত পরিবর্তন
৬. মুখ বা শরীরের লোম কমে যাওয়া
কীভাবে নির্ণয় করা হয়
সঠিক চিকিৎসার জন্য আগে কারণ জানা দরকার। চিকিৎসকেরা সাধারণত চারটি পরীক্ষা করান:
বীর্য পরীক্ষা: এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এতে শুক্রাণুর সংখ্যা, গতি, আকার ও গুণগত মান যাচাই করা হয়।
রক্ত পরীক্ষা: বিভিন্ন হরমোনের মাত্রা দেখে হরমোনজনিত সমস্যা শনাক্ত করা হয়।
আলট্রাসনোগ্রাফি: ভেরিকোসিল বা অন্য কোনো শারীরিক ত্রুটি আছে কি না, তা দেখা হয়।
জিনগত পরীক্ষা: জিনগত কারণ সন্দেহ হলে বিশেষ ক্ষেত্রে এটি করা হয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
১. এক বছর নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের পরও সন্তান না হলে
২. অণ্ডকোষে ব্যথা বা ফোলা ভাব থাকলে
৩. যৌনক্ষমতায় সমস্যা দেখা দিলে
৪. আগে অণ্ডকোষে আঘাত লাগলে বা অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে
৫. ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়ে থাকলে
পুরুষ বন্ধ্যত্ব মানেই সন্তানের আশা শেষ, এই ধারণা ঠিক নয়। চিকিৎসকেরা বলছেন, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব। সমস্যার ধরন অনুযায়ী চারটি উপায়ে সমাধান মিলতে পারে-
১. জীবনযাপনে পরিবর্তন
অনেক সময় শুধু জীবনধারা বদলালেই উল্লেখযোগ্য সুফল পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে ধূমপান ছাড়া, মাদক ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ কমানো।
২. ওষুধ
হরমোনজনিত সমস্যা বা কিছু সংক্রমণে ওষুধ কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়া যাবে না।
৩. অস্ত্রোপচার
ভেরিকোসিল বা শুক্রাণু পরিবহনের পথে বাধা থাকলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা সমাধান করা হয়।
৪. আধুনিক প্রজননপ্রযুক্তি
স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ সম্ভব না হলে এসব প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়:
আইইউআই: প্রস্তুতি শেষে শুক্রাণু সরাসরি জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়।
ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ): ল্যাবরেটরিতে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়।
ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন: একটি শুক্রাণু সরাসরি ডিম্বাণুর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। গুরুতর পুরুষ বন্ধ্যত্বে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
কখন চিকিৎসক
পুরুষের বন্ধ্যত্বে নিচের পরিস্থিতিতে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
এক বছর নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের পরও সন্তান না হলে।
অণ্ডকোষে ব্যথা বা ফোলা ভাব থাকলে।
যৌনক্ষমতায় সমস্যা দেখা দিলে।
পূর্বে অণ্ডকোষে আঘাত বা অস্ত্রোপচারের ইতিহাস থাকলে।
ক্যানসারের চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকলে।
সচেতনতা জরুরি
পুরুষ বন্ধ্যত্ব কোনো লজ্জার বিষয় নয়। এটি পুরুষত্বের ঘাটতিরও প্রমাণ নয়। এটি একটি স্বাস্থ্য সমস্যা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যার চিকিৎসা সম্ভব। সন্তান না হলে শুধু নারীর পরীক্ষা নয়, স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই একসঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সামাজিক কুসংস্কার ও ভুল ধারণা দূর করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আজ অসংখ্য দম্পতি সফলভাবে সন্তান লাভ করছেন।
অনেকেই এ ধরনের সমস্যায় নানা ধরনের টোটকা ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেন, এতে অকারণ কালক্ষেপণ ছাড়াও মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই হতাশ না হয়ে সচেতনতা, সঠিক পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও যথাযথ বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার মাধ্যমে পুরুষ বন্ধ্যত্বের সমাধান সম্ভব।