আলোকিত মানস গঠনে সাধুসঙ্গ

সাধারণ অর্থে মানুষ সাধু বলতে বোঝে সন্ন্যাসী, গেরুয়া বসনধারী ব্যক্তি, যিনি উপাসনালয়ে বসে ঈশ্বরের নাম জপেন। লালন ফকিরের দৃষ্টিতে যিনি উপাসনালয়ে গিয়ে ঈশ্বরের নামজপ করেন, তিনি সাধু নন। সাধু হলেন সৎ, ন্যায়বান, শুদ্ধচিত্ত, অন্তর খোলা, পরিশুদ্ধ, উত্তম মানুষ। সাধুর গুণ বলে শেষ করা যায় না। লালন বলেন, সাধুর গুণ যায় না বলা শুদ্ধ চিত্ত অন্তর খোলা/ সাধু দরশনে যায় মনের ময়লা, পরশে প্রেমতরঙ্গ।

সাধু হচ্ছেন আলোকিত মানুষ। আলোতে যেমন অন্ধকার দূরীভূত হয়, সাধুর স্পর্শে তেমনি মানুষের মনের অন্ধকার দূরীভূত হয়ে অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়। এমন সাধুর দর্শন পেলেই মানুষের মনের ভেতরের সব পাপ, হিংসা আর কুচিন্তার ময়লা দূর হয়ে যায়। আর সাধুর সান্নিধ্যে বা পরশে মানুষের হৃদয়ে ঐশ্বরিক প্রেমের ঢেউ বা তরঙ্গ জেগে ওঠে। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২- ১৮৫৯) ‘বোধেন্দু বিকাশ' নাটকে বলেছেন, বল দেখি জগতে সাধু বলি কারে/ পরের যে ভালো করে, সাধু বলি তারে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বাহ্যিক ভেক বা আচার-অনুষ্ঠানকে সাধুত্বের মাপকাঠি হিসেবে মানেননি। তিনি সাধুত্বকে অলৌকিকতার জগৎ থেকে টেনে এনে একদম মাটির পৃথিবীর মানুষের চেনা রূপ দিয়েছেন।

যিনি সাধনা করেন তিনি সাধক। সাধনা এক ধরনের গবেষণা। সাধক হতে হলে সাধনা বা গবেষণা করতে হয়। গবেষকরা যেমন তাদের গবেষণাকর্ম সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে তুলে ধরেন, সাধকরা সাধুসঙ্গে তেমনি তাদের সাধনাকর্ম, সাধনপদ্ধতি তুলে ধরেন। সাধুসঙ্গ সাধু, সাধক, বাউল, বাউল অনুসারী বিশেষ করে লালনভক্ত ও লালন অনুসারীদের একটা মিলনমেলা, সিম্পোজিয়াম। লালন ফকির তার জগৎ, জীবন, কর্ম, ভাবনা প্রকাশ করেছেন সংগীতের মাধ্যমে। ঐ সংগীত আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবেশিত হয় এখানকার সাধুসঙ্গে। এখানে লালন দর্শন, মানবতা, মানবধর্ম, মানবমুক্তি, বিশ্বশান্তি, সমাজভাবনা আলোচিত হয়। তাছাড়া আধ্যাত্মিক বিভিন্ন বিষয়, গুরু-শিষ্য সম্পর্ক, উদারতা-বিনয়, কাম-প্রেম, রস-রতি, নারী- পুরুষ যুগল সাধনা, যুগল মিলন, গোষ্ঠলীলা, রাধা-কৃষ্ণ লীলা সংকীর্তন, আল্লাহ-আদম- নবিতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ও আলোচিত হয়। লালন তার জীবদ্দশায়ই তার আখড়াবাড়ি ছেঁউড়িয়াতে দোল পূর্ণিমাতে এ সাধুসঙ্গ শুরু করেছিলেন, আজও তা অব্যাহত আছে। লালন অনুসারী সাধু - ভক্তদের ভাব বিনিময়ের মাধ্যমও এটি। এ যেন প্লেটোর একাডেমি। প্লেটোই প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘একাডেমি' প্রতিষ্ঠা করেন (অ্যাথেন্স, গ্রিস, ৩৮৫ খ্রি.পূ.)। তার আগে মানুষ গুরুগৃহে গিয়ে বা গুরুকে নিজ গৃহে এনে শিক্ষালাভ করত, তাও দুই/একজনে। লালনও তার মানবতাবাদী দর্শন, দীক্ষা গুরুগৃহে আবদ্ধ না রেখে সাধুসঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন। লালনের মৃত্যুর পর তার আখড়া ছেউড়িয়ায় তার ভক্তবৃন্দ তার মৃত্যু দিবস ১ কার্তিক (১৭ অক্টোবর) ও দোল পূর্ণিমা উপলক্ষ্য করে সাধুসেবা এবং সাধুসঙ্গ উদ্‌যাপন করেন।

লালন শাহের বয়স পঞ্চাশ হতে না হতেই তার শিষ্যের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। অগণিত শিষ্যকে একত্রিত করে তাদেরকে সাধনার দীক্ষা ও শিক্ষা দানের উদ্দেশে লালন সাধুসঙ্গ নামে এক মহোৎসব শুরু করেন (সম্ভবত ১৮২৩ খ্রি.)। এটা সুফি পিরদের খানকায় আয়োজিত ওরসের মতোই। এ দিন ভক্তবৃন্দ দান, অনুদান, উপঢৌকন, নজরানা নিয়ে উপস্থিত হন। এ সব দিয়ে খাওয়াদাওয়া ও আয়োজনের ব্যয়নির্বাহ করা হয়। এ দিনে ভক্তবৃন্দ গুরুর সাক্ষাৎ লাভ করে নানা তত্ত্বীয় জ্ঞান ও দীক্ষালাভ করেন। শিষ্যরা সাধন-ভজনের দীক্ষা কতটুকু আয়ত্ত করেছে, সাধক হওয়ার জন্য আর কতটুকু কী কী করতে হবে তার একটা পরীক্ষা, তারই এক মহোৎসব—এ সাধুসঙ্গ। এ দিন এখানে চলে সাধুসেবা, সাধুগুরুর পদ, সাধনা ও মানবমুক্তির আলাপন। সাধুসঙ্গের মূল উদ্দেশ্য—মানুষ হওয়া ও মানুষ চেনা। মানুষ যদি পরম আনন্দ বা পরমাত্মার সন্ধান পেতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই একজন সাধুর শরণাপন্ন হতে হবে। সাধুসঙ্গ ছাড়া মনের ভেতরের অন্ধকার দূর করা এবং আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভ করা অসম্ভব। লালন বলেন, ভজ রে আনন্দের গৌরাঙ্গ/ যদি তরিতে বাসনা থাকে/ ধর রে মন সাধুর সঙ্গ। বাউল ও বৈষ্ণব দর্শনে গৌরাঙ্গ বা শ্রীচৈতন্যদেব হলেন পরম প্রেম ও আনন্দের প্রতীক। যিনি কোনো জাত-পাত, ধর্ম বা ভেদাভেদ না মেনে মানুষকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। লালন এখানে সেই পরম আনন্দ বা ঐশ্বরিক প্রেমের স্বাদ পেতে আনন্দের গৌরাঙ্গকে ভজনা করতে আহ্বান জানাচ্ছেন। লালন মনে করেন, মানুষের যদি এসব মায়া ও মোহ অতিক্রম করে 'তরিতে বাসনা' (মুক্ত হওয়ার ইচ্ছা) থাকে, তাহলে সাধুসঙ্গই তার একমাত্র পথ। পরশ পাথরের ছোঁয়ায় যেমন লোহা সোনা হয়ে যায়, তেমনি একজন খাঁটি সাধুর সংস্পর্শে এলে মানুষের ভেতরের কলুষতা দূর হয় এবং পরম আনন্দের সন্ধান পাওয়া যায়। বিশ্বে এবং ভারতবর্ষে লালনের ‘সাধুসঙ্গ’- এর মতো অনেক সংঘ গড়ে উঠেছিল, যারা প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরষের ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে ওঠে মানবতার জয়গান গেয়েছেন, মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তির চর্চা করেছেন, আলোকিত সমাজ গঠনের কথা বলেছেন। যেমন—লুনার সোসাইটি, ইংল্যান্ড, ১৭৬৫; ট্রানসেনন্ডেন্টাল ক্লাব, আমেরিকা, ১৮৩৬); থিওসফিক্যাল সোসাইটি, নিউ ইয়র্ক, ১৮৭৫; ফ্রাংকফুর্ট স্কুল, জার্মানি, ১৯২৩; রামমোহন রায়ের আত্মীয় সভা, ১৮১৫; ডিরোজিওর একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন, ১৮২৮; মুসলিম সাহিত্য সমাজ, ঢাকা, ১৯২৬ ইত্যাদি।

ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে সুফি সাধকরা (যেমন : জালালুদ্দিন রুমি, খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী) যে খানকাহ বা আস্তানা গড়ে তুলেছিলেন, তার সঙ্গে লালনের সাধুসঙ্গের গভীর মিল রয়েছে। সেখানে গান, কবিতা (সামা কাওয়ালি) এবং প্রেমের মাধ্যমে ঈশ্বরের সন্ধান করা হতো, যেখানে জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সবার প্রবেশাধিকার ছিল। মধ্যযুগে ভারতে গড়ে উঠেছিল ভক্তি আন্দোলন ও সন্ত সমাজ। যেমন—শ্রীচৈতন্যদেবের 'নামসংকীর্তন' আসর, গুরু নানকের ‘সঙ্গাত' (যেখানে সবাই একসঙ্গে বসে প্রার্থনা করত) কিংবা সন্ত কবির ও মীরা বাঈয়ের শিষ্যদের সমাবেশগুলো ছিল লালনের সাধুসঙ্গের আদি রূপ। তারাও জাত-পাত ও পুরোহিততন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়ে মানুষের ভেতরের ঈশ্বরকে ভজনা করতেন।

ডিরোজিওর অ্যাসোসিয়েশনের মতো সংগঠনগুলো মূলত মস্তিষ্ক বা বুদ্ধির মুক্তি (Rationalism) চেয়েছিল, আর লালনের সাধুসঙ্গ বা সুফি-ভক্তি আন্দোলনের মতো ধারাগুলো চেয়েছিল হৃদয় বা আত্মার মুক্তি। তবে উদ্দেশ্য একটাই ছিল—মানুষকে সংকীর্ণতা ও অন্ধত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা। লালনের সাধুসঙ্গ যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের দেওয়াল ভেঙে মানুষে-মানুষে মিলন, মরমি সাধনা ও জাত-পাতহীন সমাজের কথা, সাম্যের কথা বলা হতো, দার্শনিক সভাগুলোতে তেমনি মানবতার কথা, মানব মুক্তির কথা বলা হতো।

লালন দর্শনের মূল কথা মনুষ্যত্ব ও আত্মশুদ্ধি। লালন বিশ্বাস করতেন, মানুষ জন্ম নিলেই প্রকৃত মানুষ হয় না, তাকে মানুষ ভজনার মাধ্যমে মানুষ হতে হয়। আর এই পথে সবচেয়ে বড় সহায়ক হলো সাধুসঙ্গ।

লালন বলেন, বেদ পড়ে ভেদ পেত যদি সবে/ গুরুর গৌরব থাকত না ভবে/ দরবেশ সিরাজ সাঁই কয় দেখরে লালন, কী হয় কিসে। এখানে বেদ বলতে শুধু সনাতন ধর্মের বেদকে বোঝানো হয়নি, বরং সব ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ বা শাস্ত্রীয় অনুশাসনকে প্রতীকী অর্থে বোঝানো হয়েছে। আধ্যাত্মিক জগৎ বা আত্মতত্ত্ব কেবল অক্ষরজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি অনুভূতির বিষয়, যা একজন যোগ্য গুরুর সান্নিধ্য ও কৃপা ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়। লালন দর্শনের মূল কথাই হলো—কিতাবি জ্ঞান মানুষকে অহংকারী ও তার্কিক করে তুলতে পারে, কিন্তু গুরুর চরণে আত্মসমর্পণ করলে মানুষের অহংকার দূর হয় এবং সে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে।

একই জল গর্তে গেলে কূপের জল হয়, নর্দমায় গেলে নর্দমার জল হয়, গঙ্গায় গেলে গঙ্গার জল হয়, সমুদ্রে গেলে সমুদ্রের জল হয়। নোংরা জল, নর্দমার জল, কূপের জল, খালের জল নদীতে গেলে ময়লাভাব থাকে না। আর সমুদ্রে গেলে সমুদ্রের বিশালতায় তা বিশুদ্ধ হয়ে যায়। জল যত ক্ষুদ্র পাত্রে থাকে, তা নোংরা হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। জল বৃহৎ পাত্রে থাকলে সে সম্ভাবনা কম বরং তা বিশুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মানুষের মন, জ্ঞান, চিন্তাও তদ্রূপ, যত ক্ষুদ্র ভান্ডারে থাকে, তা তত ক্ষুদ্র ও হীন হয়। আবার সমুদ্র বা আকাশের মতো বিশাল ভান্ডারের কথা ভাবলে তা তত বড় ও উৎকৃষ্ট হয়। সেজন্য সঙ্গের একটা গুরুত্ব রয়েছে। সাধুসঙ্গ হলো স্বর্গীয় উদ্যান, যেখানে একই সঙ্গে মেলে পরম আনন্দ ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান।

লেখক: সম্পাদক, এনসিটিবি