৭৮৭ দিনেও ফিরিল না নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ!

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৯

দেশের প্রায় ৪০ হাজার বেসরকারি এমপিওভুক্ত নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৭৮৭ দিন ধরিয়া নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদবিহীন অবস্থায় চলিতেছে। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে-দফায় দফায় অ্যাডহক কমিটি গঠন করিয়া প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যক্রম চালু রাখা হইলেও নিয়মিত ব্যবস্থাপনা কমিটি ও গভর্নিং বডির অভাবে প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে জটিলতা দেখা দিয়াছে।

নির্বাচিত কমিটি গঠনের প্রস্তুতি চলিবার মধ্যেই নতুন প্রবিধানমালা চূড়ান্ত না হইবার কারণ দেখাইয়া নির্বাচন স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। ফলে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা আরো দীর্ঘায়িত হইবার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি মিলাইয়া প্রায় ৪০ হাজার প্রতিষ্ঠানে ৫ লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রহিয়াছেন এবং ১ কোটি ৬৫ লক্ষ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করিতেছে। মাধ্যমিক হইতে কলেজ পর্যায় পর্যন্ত প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারিভাবে পরিচালিত হয়। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর শিক্ষাজীবন, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার সহিত পরিচালনা পর্ষদের কার্যকারিতা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। সুতরাং কমিটি গঠনের বিষয়টিকে কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা হিসাবে দেখিবার অবকাশ নাই।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট হইতে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির পরিচালনা কমিটির সভাপতিদের অপসারণ করা হয়। পরে ২০ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়। নিয়মিত কমিটি গঠনের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসাবে এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হইলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় নাই। অথচ বিধান অনুযায়ী, কোনো কারণে নিয়মিত কমিটি গঠন সম্ভব না হইলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য অ্যাডহক কমিটি গঠনের সুযোগ রহিয়াছে। সেইখানে ৭৮৭ দিন ধরিয়া এই অস্থায়ী ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীলতা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনার দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করিয়া তুলিয়াছে। অ্যাডহক কমিটির ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, এই কমিটি অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপারিনটেনডেন্ট, গ্রন্থাগারিক কিংবা কর্মচারী নিয়োগ করিতে পারে না। কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দণ্ড আরোপের ক্ষেত্রেও শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি গ্রহণ করিতে হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হইতে পারে। আর্থিক ও নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রমে বিধিনিষেধ থাকিলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়া স্বাভাবিক। ইহার প্রভাব শেষ পর্যন্ত শিক্ষার পরিবেশ ও মানের উপরও পড়িতে বাধ্য।

এইদিকে নতুন প্রবিধানমালায় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি নির্বাচনের পদ্ধতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হইয়াছে। সদস্য নির্বাচনের পর নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সভাপতি নির্বাচনের বিধান, সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমান নির্ধারণ এবং একই ব্যক্তির একাধিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে সীমা আরোপের প্রস্তাব এই সংস্কারের অংশ। নিয়মতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিচালনা নিশ্চিত করিতে প্রবিধানমালা সংশোধনের প্রয়োজন থাকিতে পারে। কিন্তু বিধিমালা চূড়ান্ত না হইবার কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য নির্বাচন স্থগিত রাখিবার সিদ্ধান্ত সেই প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না-তাহা বিবেচনা করা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে অভিভাবক ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের মাধ্যমে তাহারা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার পরিবেশ সম্পর্কে নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পান। নির্বাচন স্থগিত থাকিলে সেই প্রতিনিধিত্ব সংকুচিত হয়। অ্যাডহক কমিটিকে ভর্তি-বাণিজ্যের সুযোগ করিয়া দেওয়ার অভিযোগও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহলে উঠিয়াছে। সুতরাং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হইবে দ্রুত নতুন প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করা এবং নির্বাচনের একটি সুস্পষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা। প্রবিধান সংশোধনের কাজ চলাকালে বিদ্যমান বিধির আলোকে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব কি না, তাহাও আইনগতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার দায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের উপর চাপাইয়া দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মতান্ত্রিক পরিচালনা ফিরাইয়া আনা জরুরি।

ইত্তেফাক/এএম