যাহারা কীর্তিমান তাহাদের জাতীয় স্বার্থে বারংবার স্মরণ করা প্রয়োজন। কেননা তাহাদের রাখিয়া যাওয়া আদর্শ ও পথনির্দেশনা আমাদের জীবনে পাথেয়স্বরূপ। উনিশ শতাব্দীর বিখ্যাত আমেরিকান কবি হেনরি ওয়াডসঅর্থ লংফেলো ১৮৩৮ সালে লিখেন তাহার সেই স্মরণীয় কবিতা আ সাম অব লাইফ (A Psalm of Life)। এই কবিতায় তিনি লিখিয়াছেন: ‘লাইভস অব গ্রেট মেন অল রিমাইন্ড আস/ উই ক্যান মেক আওয়ার লাইভস সাবলাইম,/ অ্যান্ড, ডিপার্টিং, লিভবিহাইন্ড আস/ফুটপ্রিন্টস অন দ্য স্যান্ডস অব টাইম।’ যাহার মর্মার্থ হইল-মহৎ ব্যক্তিদের জীবন আমাদের মনে করাইয়া দেয় যে, আমরাও আমাদের জীবনকে মহিমান্বিত করিতে পারি। তাহারা চলিয়া গেলেও সময়ের বালুচরে যে পদচিহ্ন বা কীর্তি তাহারা রাখিয়া যান তাহা আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। এমনই একজন মহৎপ্রাণ ব্যক্তি হইলেন এম এ সামাদ (১৯২৩-২০০৫)।
গতকাল ছিল মোহাম্মদ আজিজুস সামাদ বা এম এ সামাদের ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী। অনন্তযাত্রার ২১ বৎসর অতিবাহিত হইয়া গেলেও তিনি আজও আমাদের হৃদয়ে অমলিন। বিরল প্রতিভার অধিকারী এম এ সামাদকে বলা হয় দেশের বিমা শিল্পের স্থপতি। তিনি একজন সংস্কৃতিমান ও পণ্ডিত ব্যক্তি, ভাষাসৈনিক, লেখক ও সাংবাদিক। ইহার পাশাপাশি দেশের প্রথম বেসরকারি নন-লাইফ বিমা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। ক্ষণজন্মা ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্বের অধিকারী এম এ সামাদ ১৯২৩ সালের ১ জানুয়ারি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। কলিকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ হইতে সর্বোচ্চ কৃতিত্বের সহিত অর্জন করেন স্নাতক ডিগ্রি। ভারত ভাগের পূর্বে তিনি দিল্লির অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বাংলা সংবাদের অন্যতম প্রধান সম্পাদক ও বার্তা পরিবেশক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় ভারতীয় মহাদেশীয় চিন্তাজগতের অন্যতম প্রখ্যাত পণ্ডিত নীরদ সি চৌধুরীর সান্নিধ্য লাভ করেন তিনি। দেশভাগের পর রেডিও পাকিস্তানে কর্মরত থাকাকালে ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালে সূচিত ভাষা অধিকার আন্দোলনের সহিত সক্রিয়ভাবে যুক্ত হইয়া পড়েন তিনি। ফলে তাহাকে রেডিও পাকিস্তানের চাকরি হইতে পদত্যাগ করিতে বাধ্য করা হয়। ইহার পর সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ হিসাবে তিনি ও তাহার স্ত্রী ফৌজিয়া বেগম ১৯৪৯ সালে প্রকাশ করেন শিশু-কিশোরদের জন্য প্রথম ব্যতিক্রমী ও রুচিশীল বাংলা সাময়িকী ‘মিনার’। এইখান হইতে বাহির হইয়া আসেন এমন সকল প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী যাহারা তৎকালীন সময়ে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে পালন করেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। ১৯৫১ সালে প্রুডেনশিয়াল লাইফ ইনসিওরেন্সের চাকুরিতে যোগদানের মাধ্যমে বিমা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জীবন বিমা কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে পালন করেন অনন্য ভূমিকা। প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ইনসিওরেন্স একাডেমি এবং ১৯৮৫ সালে গঠন করেন ‘বাংলাদেশ জেনারেল ইনসিওরেন্স কোম্পানি লিমিটেড’, যাহা বিজিআইসি (BGIC) নামে সমধিক পরিচিতি। ইহার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে প্রথম বারের মতো নন-লাইফ বিমা ব্যবস্থার শুভ সূচনা করেন।
এম এ সামাদ দেশের বিমা মালিকদের শীর্ষ ফোরাম ‘বাংলাদেশ ইনসিওরেন্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর চেয়ারম্যান ছিলেন একাধিক বার এবং পুঁজিবাজারের সার্বিক কাঠামোর প্রসারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কাউন্সিলর নির্বাচিত হইয়া গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক প্রযুক্তিগত সহায়তা কর্মসূচির একজন তালিকাভুক্ত আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং ইউএনডিপি ফেলোশিপের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিমা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করেন। ইহা ছাড়া বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা তাহার চারটি মৌলিক গ্রন্থ বাংলাদেশে বিমা শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রামাণ্য পাঠ্যবই হিসাবে পঠিত। তাহার রচিত ‘শনিবারের ছুটি’ শীর্ষক ছোটগল্প সংকলনটি বাংলা কথাসাহিত্যে তাহার নান্দনিক ও সংবেদনশীল রুচির সুস্পষ্ট স্বাক্ষর বহন করে।
এম এ সামাদ ২০০৫ সালের ১৭ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন। তাহার মতো একজন পথিকৃৎ ব্যক্তি যুগ যুগ ধরিয়া স্মরণীয় ও বরণীয় হইয়া থাকিবেন। আমরা তাহার রুহের মাগফেরাত কামনা করি। আল্লাহ তাহাকে জান্নাত নসিব করুন।