বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের আজ বিজয়া দশমী। বিজয়া দশমীর এই দিনে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়া সমাপ্তি ঘটিবে পাঁচ দিনের পূজার আনুষ্ঠানিকতার। শরতের স্নিগ্ধ প্রকৃতি, ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি এবং আলোকসজ্জায় মুখরিত হইয়া উঠিয়াছে দেশের পূজামণ্ডপগুলি। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্যানুযায়ী, এই বৎসর সমগ্র দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হইতেছে, যাহা গত বৎসরের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার বেশি।
শারদীয় এই উৎসবের নেপথ্যে রহিয়াছে দশরথপুত্র শ্রীরামচন্দ্রের অবদান। বনবাসী রামচন্দ্র স্বর্ণলঙ্কার রাক্ষসরাজ রাবণের নিকট হইতে প্রিয়তমা স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করিবার বাসনায় শরৎকালে দেবীকে অকালবোধন করিয়াছিলেন। হিন্দু শাস্ত্রানুসারে, অসুর শক্তির নিকট পরাভূত দেবতারা স্বর্গলোকচ্যুত হইলে, সকল দেবতার তেজরশ্মি বা সামগ্রিক শক্তির মহাসম্মিলনে অসুরবিনাশী দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটানো হয়। দশভূজা দেবী দুর্গা মাতৃশক্তিরও প্রতীক—তিনি মর্ত্যে আসিয়া অশুভ শক্তির বিনাশের মাধ্যমে শুভশক্তিকে প্রতিস্থাপন করেন বলিয়া সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন। পঞ্জিকাভেদে চলতি বৎসর দেবী দুর্গার আগমনের বাহন লইয়া দুইটি ভিন্ন মত রহিয়াছে। গুপ্ত প্রেস পঞ্জিকা অনুযায়ী দেবীর আগমন ঘটিতেছে ঘোটকে বা ঘোড়ায়, যাহার ফলস্বরূপ ‘ছত্রভঙ্গ’ অর্থাৎ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক অস্থিরতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে, বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী দেবীর আগমন ঘটিবে গজে বা হাতিতে, যাহা অত্যন্ত শুভ এবং পৃথিবীতে শস্যসমৃদ্ধি ও শান্তির প্রতীক। তবে উভয় পঞ্জিকা মতেই বিজয়া দশমীতে দেবী কৈলাসে প্রস্থান করিবেন নৌকায় চড়িয়া। শাস্ত্রমতে নৌকায় গমনের ফলে পৃথিবীতে প্রচুর ফসল বৃদ্ধি পায় এবং ভক্তদের মনোকামনা পূর্ণ হয়, যদিও ইহার সহিত অতিবৃষ্টি বা বন্যার প্রবল আশঙ্কাও যুক্ত থাকে। দেবী দুর্গার মধ্যে মাতৃরূপ ও সংহাররূপের যেই সম্মিলন, তাহারও একটি বিশেষ তাৎপর্য রহিয়াছে। মাতৃত্ব এইখানে অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধেরও শক্তি। অন্যায়ের বিনাশ এবং জীবের দুর্গতি নিবারণের এই প্রত্যয় আবহমান কাল ধরিয়া সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বহন করিতেছেন।
এই বৎসরের দুর্গোৎসবের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নাগরিকের সমান অধিকারের প্রশ্নটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রংপুরে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যাইবার পথে তারাগঞ্জের চৌপথিতে বলিয়াছেন, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার'। তিনি আরো বলিয়াছেন, ধর্ম- বর্ণনির্বিশেষে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করিতে হইবে। মুক্তিযুদ্ধে সকল ধর্মের মানুষের সম্মিলিত ত্যাগের কথাও তিনি স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রহিয়াছে রাষ্ট্রের সর্বজনীন চরিত্রের স্বীকৃতিতে। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হইলেও নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে সকল মানুষ সমান। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা, উপাসনালয়ের সুরক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত হইবে—ইহাই প্রত্যাশিত। বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সহাবস্থান এক মূল্যবান ঐতিহ্য। মণ্ডপে মানুষের সমাগম, শিল্পীদের সৃজনশীলতা এবং প্রতিবেশীদের পারস্পরিক অংশগ্রহণ এই সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, বৈচিত্র্যের মধ্যেই সমাজের সৌন্দর্য। একটি বাগানের সৌন্দর্য যেমন বিবিধ বর্ণ ও গন্ধের ফুলের সমাবেশে পূর্ণতা পায়, তেমনি একটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যও তাহার নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উপস্থিতিতে সমৃদ্ধ হয়। সেই বৈচিত্র্যকে সম্মান করিবার মধ্য দিয়াই একটি উদার, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি সুদৃঢ় হইতে পারে।
দেবী দুর্গার মহিষাসুরবধের প্রতীকী তাৎপর্য আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয়, অশুভের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখিতে হয়। বিশ্বে এখন যুদ্ধাবস্থা চলিতেছে, দিকে দিকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাইতেছে। এই অবস্থা হইতে উত্তরণের জন্য আমাদের মধ্যকার সকল শুভশক্তিকে একত্রিত হইতে হইবে, কারণ একতার মধ্যেই অজেয় শক্তি লুক্কায়িত রহিয়াছে। সকল শুভশক্তির সম্মিলনে এই জগতের কল্যাণ সাধিত হউক। সনাতন ধর্মাবলম্বী সকলকে জানাই শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রীতি ও শুভেচ্ছা।