রাখঢাকে না গিয়ে, সত্য না লুকিয়ে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যদণ্ড কার্যকর করার পূর্বাপরে তথ্যের ঘাটতি বিষয়টি উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। বিষয়টির স্পর্শকাতরতার দিকও আমলে নিয়েছেন। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশ ও প্রধানমন্ত্রীর গভীর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, দুদেশই জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ। অভিযোগ বা অপরাধের বিষয় সামনে এনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে যাওয়াকে হতাশাজনক বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
বিচার বা মৃত্যুদণ্ডও হয়ে গেছে। এ নিয়ে করার কিছু নেই। তাদের জীবন আর ফিরে আসবে না। তবে যৌক্তিক আলোচনা হওয়া দরকার। গঠনমূলক সমালোচনাও কাঙ্ক্ষিত। তবে এ ঘটনাকে ঘিরে মনগড়া বয়ান তৈরির সুযোগ দেওয়া যাবে না, দুঃখজনকভাবে যা চলছে কদিন ধরে। এতে সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একটি মহল সেই দূরত্বই চায়। তারা সেই সুযোগ পেয়েছে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক ঘটনায়। ঘটনাই তাদের সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। সেখানকার আইন ও সংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের দুজন নাগরিকের বিচার হলো, অথচ বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ আগে বিষয়টি জানতে পারেনি; সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আসে— এমন বাস্তবতা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তথ্যের ঘাটতি না থাকলে এ ধরনের ঘটনায় আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারত।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদসহ কেউ কেউ বলেছেন, সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। শিক্ষা তো অবশ্যই। প্রশ্ন থেকে যায়, শিক্ষা কার জন্য? জবাব না প্যাচিয়ে বলা যায়, প্রবাসীদের জন্য যেমন শিক্ষা, তাদের আইনি সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্যও শিক্ষা। দেশের বাইরে কোনো নাগরিক গ্রেফতার হলে তার অভিযোগ বোঝতে পারা, আইনজীবী পাওয়া, আত্মপক্ষে বক্তব্য জানানোর সুযোগ পাওয়াসহ কিছু বিষয় থাকে। তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের শিকার দুজনের পরিণতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সৌদি আরবের আইনে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। আইনজীবী নিয়োগে সহায়তা, কনস্যুলার যোগাযোগ, আপিলের সুযোগ এবং দণ্ড লঘু করার আবেদন—এসব বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল, তা পর্যালোচনা করা জরুরি। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ১৮ অক্টোবর সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে তথ্যনির্ভর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা সবার কাছ থেকেই প্রত্যাশিত। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্পর্ক বজায় রাখা ও আরো জোরদার করা জাতীয় স্বার্থের অংশ। সৌদি আরবে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি প্রবাসী তাদের শ্রম ও উপার্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাই সম্পর্কের গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রবাসীদের সুরক্ষা ও মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যেই ন্যায্য প্রশ্ন করা যায়; নিজের নাগরিকের ন্যায্যবিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা দায়িত্বশীল কূটনীতির অংশ।
কয়েক মাস ধরে আদালতে বিচার চলল, একটি রায় হলো, উচ্চতর কর্তৃপক্ষ তা বহাল রাখল, রাজকীয় আদেশে দণ্ড কার্যকরও হলো— অথচ এই পুরো সময় বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন বিষয়টি জানতে পারেনি। সরকার ও বিরোধী দলগুলোর কাছেও বিষয়টি আগে স্পষ্ট ছিল না—এ বাস্তবতা বিস্ময়কর। অবশ্যই বিদেশে অবস্থানকারী প্রত্যেক নাগরিককে সে দেশের আইন মানতে হয়। কিন্তু বিদেশে কোনো নাগরিক অভিযুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট দেশেরও কিছু বিধিবদ্ধ দায়িত্ব থাকে। সেখানে কোনো নাগরিক অভিযুক্ত হলে তার সঙ্গে কনস্যুলার যোগাযোগ, আইনজীবী ও দোভাষীর ব্যবস্থা এবং বিচারপ্রক্রিয়া যথাযথভাবে চলছে কি না, তা পর্যবেক্ষণে মিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে বিধান রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কনস্যুলেটকে না জানালেও মিশন সক্রিয় ভূমিকা পালন করলে এ ধরনের মামলার খবর পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। উল্লেখ্য, সুদৃঢ় কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে একাধিক দেশ সৌদি আরবে নিজ নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড এড়াতে সক্ষম হয়েছে বলে নজির রয়েছে।
মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির এবং সিঁথি আক্তারের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আদালতের রায় কার্যকর হওয়ার ঘটনাটি বিশ্ব জুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, স্থান ও সময়ের পবিত্রতা এবং মর্যাদাহানির মতো গুরুতর অপরাধে ইসলামি বিচারশাস্ত্রের 'তাজির’ বিধানে এই সর্বোচ্চ দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ঐ দুজনকে তাআজিরের আওতায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ইসলামি বিচারব্যবস্থায় তাআজির এমন একধরনের শাস্তি, যেখানে বিচারকের বিবেচনার সুযোগ থাকে। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র বাধ্যতামূলক শাস্তি নয়। ১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন এই মামলার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। এই কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিক গ্রেফতার হলে তাকে কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার জানাতে হয়। তিনি অনুরোধ করলে তার দেশের কনস্যুলেটকে অবহিত করতে হয়। কনস্যুলার কর্মকর্তারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং আইনি প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করতে পারেন। বাংলাদেশ মিশন কেন বিচারপ্রক্রিয়ার খবর পায়নি, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে, 2025 সালে দেশটিতে অন্তত ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও ছিলেন। বিশেষ করে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়ে সংস্থাটি গুরুতর উদ্বেগ জানিয়েছে। বিদেশি নাগরিকদের বিচারিক অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
গত সেপ্টেম্বর সংসদে জানানো হয়, ১৩টি দেশে ২২টি আইন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আইনি সহায়তার চুক্তি হয়েছে। সৌদি আরবে দুটি সেফ হোমও রয়েছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে একটি কার্যকর সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা। গুরুতর মামলায় দ্রুত আইনজীবী নিয়োগ, বাংলা ভাষায় আইনি সহায়তা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মৃত্যুদণ্ডের মামলায় আগাম কূটনৈতিক উদ্যোগের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এ ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আইন বা ধর্মীয় অনুভূতির ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতা বা দায়িত্বহীন আচরণের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। বিদেশের মাটিতে এ ধরনের ঝুঁকি এড়াতে আমাদের মানসিকতা এবং দৈনন্দিন আচরণে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। মোট কথা, বাস্তবতা বুঝে চলা জরুরি। স্বাগতিক দেশের সরকার, আইন, ধর্মীয় বিশ্বাস বা স্থানীয় সমাজ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো নেতিবাচক পোস্ট বা ব্যঙ্গ করা থেকে বিরত থাকার বিকল্প নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অসতর্ক মন্তব্য, ব্যঙ্গ্যক পোস্ট বা কোনো উসকানিমূলক কনটেন্টে শুধু একটি 'লাইক' দেওয়ার কারণেও অনেকের ভিসা বাতিল হয়েছে, এমনকি কারাবরণও করতে হয়েছে।
কোনো নাগরিককে থাকতে দেওয়া বা বের করে দেওয়ার বিষয়ে সে দেশের নিজস্ব আইন ও সার্বভৌম কর্তৃত্ব রয়েছে। পবিত্র স্থানগুলো ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির জায়গা। সেখানে এমন কোনো আচরণ বা মেলামেশা করা যাবে না, যা স্থানীয় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করে। অন্যের দেশে থাকা কোনো জন্মগত অধিকার নয়; এটি তাদের দেওয়া একটি সাময়িক অনুমতি। তারা তাদের নিরাপত্তা ও শান্তির স্বার্থে আইন অনুযায়ী এ অনুমতি প্রত্যাহার করতে পারে। একজন প্রবাসীর ভুল কেবল তার নিজের বা পরিবারের জীবনেই অন্ধকার নামিয়ে আনে না, তা পুরো দেশের ভাবমূর্তিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সৌদি আরবের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো সংবেদনশীল। বিশেষ করে পবিত্র মক্কা নগরী বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম উম্মাহর আধ্যাত্মিক কেন্দ্রস্থল, তাওহিদের পুণ্যভূমি। এই ভূখণ্ডের প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি মসজিদ কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখার অংশ নয়; বরং তা বিশ্ব মুসলিমের ইমান, ভক্তি ও পবিত্রতম অনুভূতির প্রতীক। সৌদি আরবে কোনো বিদেশি নাগরিক অপরাধ করলে সে দেশের আইন অনুযায়ী বিচার ও শাস্তির বিধান প্রযোজ্য।
প্রবাসীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো সুদৃঢ় করা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রবাসীদেরও মনে রাখতে হবে, বিদেশে আইন মেনে চলা, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং দায়িত্বশীল আচরণ করা তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
