বাস, ট্রেন, বিমান বা নৌকায় নামাজ আদায়ের সঠিক পদ্ধতি

দৈনন্দিন প্রয়োজনে বাস, ট্রেন, লঞ্চ, জাহাজ কিংবা উড়োজাহাজে যাতায়াত করতে হয় অনেককেই। এ সময় নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গেলে কীভাবে নামাজ আদায় করতে হবে, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন থাকে। ইসলামে সফরকালেও নামাজ আদায়ের গুরুত্ব রয়েছে। তবে যানবাহনের ধরন, দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার সুযোগ, কিবলামুখী হওয়ার সক্ষমতা এবং রুকু-সিজদা করার পরিস্থিতি বিবেচনায় পদ্ধতিতে পার্থক্য হতে পারে।

লঞ্চ ও নৌকায় নামাজ
লঞ্চ বা নৌকা ঘাটে স্থিরভাবে বাঁধা থাকলে এবং নিরাপদে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকলে স্বাভাবিক নিয়মে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে হবে। রুকু ও সিজদাও যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।

চলন্ত লঞ্চ বা নৌকায় নামাজের সময় নিরাপদে দাঁড়ানো সম্ভব হলে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে হবে। কিবলার দিক নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী মুখ ফেরানোর চেষ্টা করতে হবে। যানবাহনের গতির কারণে কিবলার দিক পরিবর্তিত হলে সম্ভব হলে নামাজের মধ্যেই কিবলামুখী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

তবে অসুস্থতা, মাথা ঘোরা কিংবা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দাঁড়ানো সম্ভব না হলে বসে নামাজ পড়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সক্ষমতা অনুযায়ী রুকু ও সিজদা করতে হবে।

ট্রেন ও বিমানে নামাজ
ট্রেন ও বিমানে নামাজের সময় দাঁড়ানো, কিবলামুখী হওয়া এবং রুকু-সিজদা করার সুযোগ রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করতে হবে। নিরাপদে দাঁড়ানোর জায়গা থাকলে স্বাভাবিক নিয়মে নামাজ আদায় করাই মূল বিধান। শরীরের ভারসাম্য রাখতে প্রয়োজনে কোনো কিছু ধরে দাঁড়ানো যেতে পারে।

যাত্রাপথে কিবলার দিক নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সহায়তা নেওয়া কিংবা দিকনির্ণয়ের উপকরণ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে নিরাপত্তার নিয়ম ভেঙে বা অন্য যাত্রীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে নামাজ আদায় করা উচিত নয়।

প্রচণ্ড ভিড় বা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে দাঁড়ানো কিংবা স্বাভাবিকভাবে রুকু-সিজদা করা সম্ভব না হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মাজহাবভেদে কিছু বিধানগত পার্থক্য রয়েছে। তাই নামাজের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আগে কীভাবে নামাজ আদায় করা সম্ভব, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

বাসে নামাজ আদায়ের নিয়ম
চলন্ত বাসে সাধারণত দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া কিংবা কিবলামুখী হয়ে রুকু-সিজদা করা কঠিন। এ কারণে প্রথমে বাস থামিয়ে নামাজ পড়ার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। চালক বা সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে নিরাপদ স্থানে বিরতি নেওয়া সম্ভব হলে সেখানে নেমে নামাজ আদায় করা ভালো।

বাস যদি না থামে এবং কেউ যদি সিট খালি করে হাঁটু গেড়ে বসে স্বাভাবিক রুকু ও সিটের ওপর সিজদা আদায় করতে পারে এবং কিবলা ঠিক রাখতে পারে, তবে অনেক আলেমের মতে সেই নামাজ আদায় হয়ে যাবে। অনেকে নিজের আসনে বসে সামনের সিটের পেছনে কপাল ঠেকিয়ে সিজদা করেন; সর্বসম্মত মতে এভাবে নামাজ হয় না, তা পুনরায় আদায় করতে হবে।

যদি কোনো অবস্থাতেই নামাজ আদায়ের ফরজের শর্তগুলো পূরণ করা সম্ভব না হয়, তবু সময় পার না করে যেভাবে সম্ভব (সিটে বসে ইশারায় হলেও) নামাজ আদায় করে নেওয়া উচিত, যাকে ইসলামের পরিভাষায় ‘হুরমাতুল ওয়াক্ত’ বলা হয়। এতে অন্তত ওয়াক্ত ছেড়ে দেওয়ার কবিরা গুনাহ থেকে বাঁচা যাবে, তবে পরে সুযোগমতো এই নামাজ কাজা আদায় করে নিতে হবে।

সফরে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো, যথাসম্ভব নামাজের নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ করা এবং ওয়াক্তের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক বিধান জানতে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

সূত্র: আহসানুল ফাতাওয়া ৪/৮৮; রদ্দুল মুহতার ২/১০২, ইলাউস সুনান ৭/২১২; জাওয়াহিরুল ফিকহ ৩/৬২, মাআরিফুস সুনান ৩/৩৯৪-৯৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৮,১৪৪)