রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ইউরোপ, প্রাণ গেল ৫০ হাজারের বেশি মানুষের 

চলতি বছরের গ্রীষ্মে ইউরোপ জুড়ে বয়ে যাওয়া তীব্র দাবদাহে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এটি ইউরোপে তাপজনিত মৃত্যুর রেকর্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী গ্রীষ্ম হতে পারে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সিএনএনের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

গবেষণায় বলা হয়, এসব মৃত্যুর মধ্যে ৩২ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর জন্য সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট দূষণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়িয়ে তাপপ্রবাহকে আরও তীব্র করছে। 

গবেষণার অন্যতম লেখক ও লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষক ক্লেয়ার বার্নস বলেন, দাবদাহজনিত মৃত্যুর সংখ্যার বিচারে ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ইউরোপের অর্ধেকেরও বেশি এলাকার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। 

জাতিসংঘের বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কে আন্তর্জাতিক নেতাদের একত্রিত হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই ভয়াবহ তথ্য সামনে এলো। 

এর মাত্র কয়েক দিন আগেই জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছিল, শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার যে সুযোগ বিশ্বের সামনে ছিল, তা এখন পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।

গবেষক ক্লেয়ার বার্নস বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতিগুলো ঠেকানোর পথ থেকে আমরা অনেকটাই ছিটকে গেছি। সরকারগুলোকে বুঝতে হবে যে, দ্রুত পদক্ষেপ ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি কেবল আরও খারাপের দিকেই যাবে। 

বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ এখন ইউরোপ এবং চরম আবহাওয়া সম্পর্কিত দুর্যোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী রূপ নেওয়া এই দাবদাহ সেখানকার মানুষের জন্য ইতোমধ্যেই অসহনীয় হয়ে উঠছে। চলতি বছরের মে মাসের শেষ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত নজিরবিহীন উচ্চ তাপমাত্রা পুরো মহাদেশকে যেন ঝলসে দিয়েছে। 

পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তপ্ত গ্রীষ্মকাল ছিল এটিই। এ সময় তাপমাত্রা ১৯৯১-২০২০ সালের গড় তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় ২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৫.২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বেশি ছিল। তবে কোনো কোনো দিনে অবস্থা ছিল আরও ভয়াবহ; কিছু দেশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (২১.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত বেশি রেকর্ড করা হয়েছে।

গবেষকরা দেখছেন যে, দাবদাহজনিত মৃত্যুর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে দাবদাহে হওয়া মোট মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণ; যেখানে আজ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে।

এ বিষয়ে ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাকেল নুনেস বলেন, দাবদাহ কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে এই গবেষণার ফল তারই প্রমাণ তুলে ধরে। এর প্রভাব সবসময় সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান না হওয়ায় একে প্রায়শই ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। 

অধ্যাপক নুনেস উল্লেখ করেন, এখানে অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হলো কম বয়সী মানুষের মৃত্যু। ৬৫ বছরের কম বয়সী হাজার হাজার মানুষ এই দাবদাহে মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।