মানুষকে হত্যা করিও না, মানুষ এমনিতেই মরিবে—দার্শনিক এক কবির এই কথাটির মধ্যে রহিয়াছে মানবজীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের সহজ প্রকাশ। মৃত্যু অনিবার্য বলিয়াই মানুষের জীবন এত মূল্যবান। সেই জীবন কাড়িয়া লইবার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা জনতার নাই। অথচ আমাদের দেশের একশ্রেণির মানুষ ক্রমশ সেই অধিকার নিজের হাতে তুলিয়া লইতেছে ছেলেখেলা করিয়া। কখনো নেহাত সন্দেহ, গুজব, অভিযোগ কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অজুহাতে মানুষকে পিটাইয়া হত্যা করা হইতেছে। মনে হইতেছে, ফাঁসির মঞ্চ যেন জনগণ নিজেদের হাতে তুলিয়া লইয়াছে। প্রশ্ন হইল, এই ঔদ্ধত্যের উৎস কোথায়? এই জিঘাংসার শক্তি কোথা হইতে আসে?
বাংলাদেশে গণপিটুনির ঘটনা পূর্বে ঘটিত না, এমন নহে; কিন্তু সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে ইহার ব্যাপকতা গভীর উদ্বেগের কারণ হইয়া উঠিয়াছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৩ সালে গণপিটুনিতে নিহত হন ৫১ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বাড়িয়া দাঁড়ায় ১২৮-এ। ২০২৫ সালে নিহত হন ১৯৮ জন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আসকের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১৭১। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসে ৩৯৮টি গণপিটুনির ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত এবং ৪০১ জন আহত হইয়াছেন। পরিসংখ্যানের উৎস ও গণনার পদ্ধতিভেদে সংখ্যায় পার্থক্য থাকিতে পারে; কিন্তু উভয় সংস্থার তথ্যই একটি ভয়াবহ বাস্তবতার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করিতেছে। মানুষের জীবন ক্রমশ জনতার উন্মত্ততার নিকট অসহায় হইয়া পড়িতেছে; কিন্তু প্রশ্ন হইল, কেন এই প্রবণতা? চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই কিংবা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠিলেই একদল মানুষ বিচারকের আসনে বসিয়া পড়িবেন কেন? এই অধিকার তাহাকে কে দিয়াছে? অভিযোগ মানেই অপরাধের প্রমাণ নহে। অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের আইন, আদালত ও বিচারব্যবস্থা রহিয়াছে। সেই প্রক্রিয়া পাশ কাটাইয়া জনতা যখন কাউকে পিটাইয়া হত্যা করে, তখন তাহা ন্যায়বিচার থাকে না, পরিণত হয় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে।
এই প্রবণতার পিছনে বহু ধরনের মনস্তত্ত্ব কাজ করিতেছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতার ভূমিকা তো রহিয়াছেই। মানুষ যখন মনে করে, অপরাধ করিয়া পার পাওয়া যায়, কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাসময়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে না, তখন সমাজের মধ্যে শৃঙ্খলা ভাঙিয়া পড়ে। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বও অনেক সময় জনতাকে ব্যবহার করিবার ক্ষেত্র তৈরি করে। বিশেষত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গণপিটুনি প্রতিরোধে দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগের অভাব মানুষের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ ও আতঙ্ক বাড়াইয়া দিয়াছিল বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। রাষ্ট্রের নীরবতা যখন অপরাধীর মনে দুঃসাহস জোগায়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইবার প্রবণতা জন্মে।
বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হইল, প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যৎ সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কারণ, রাষ্ট্রের দুর্বলতা কখনো জনতার হাতে হত্যার লাইসেন্স হইতে পারে না। বরং এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরো বাড়িয়া যায়। একটি মানুষকে জনতার সামনে পিটাইয়া মারিবার সময় উপস্থিত লোকেরা যখন নীরব দর্শক থাকেন, তখন কেবল একজন মানুষের মৃত্যু ঘটে না, সমাজের বিবেকও অবরুদ্ধ হইয়া যায়। মনে রাখিতে হইবে, আজ যেই জনতা অন্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করিতেছে, কাল সেই জনতারই কোনো সদস্য একইভাবে গণপিটুনির শিকার হইতে পারেন।
মানুষ মরিবে, ইহাই জীবনের অনিবার্য পরিণতি; কিন্তু সেই মৃত্যুর সময়, কারণ ও বিচার নির্ধারণের অধিকার উন্মত্ত জনতার হাতে ছাড়িয়া দেওয়া যায় না। যেইখানে জনতাই বিচারক, জনতাই জল্লাদ—সেইখানে কোনো মানুষই নিরাপদ নহে। রাষ্ট্র যদি মানুষের জীবন রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তাহা হইলে আইনের শাসন সুদূর পরাহত হইতে থাকে। কালিমালিপ্ত হয় উন্নয়নের গৌরব- গ্রাফ। এইভাবে তো চলিতে পারে না।