'সেকেলে বোকামি' থেকে সরে আসা প্রয়োজন

হেলেনের দরবারে বা আসরে যারা উপস্থিত ছিল তারা দেখলেন ক্ষীণ আলোতে ইউনিফর্ম গায়ে, মাথায় মিলিটারি টুপি একটি অবয়ব এসে হাজির হলো এবং গুরুগম্ভীর স্বরে বলল, “মাই শিপ ওয়াজ সাংক অ্যান্ড আই ডাইড’ অর্থাৎ ‘আমার জাহাজটি ডুবে গিয়েছিল এবং আমি মরে গেলাম ।’

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৫

রাষ্ট্র আইন তৈরি করে জনগণের কল্যাণের জন্য, জনগণের জানমালের নিরাপত্তার জন্য। এই আইন তৈরি হয় বা হওয়া উচিত সমাজের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। আর্যরা বাংলায় আসার আগে এখানে কোনো বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ে শাসক ছিল না। তখন বিভিন্ন ছোট ছোট গোত্র নিজেদের দলনেতা নির্বাচন করত, যাকে কৌম বা গ্রোত্র শাসন ব্যবস্থা বলা যায়—অনেকটা পঞ্চায়েত শাসন ব্যবস্থার মতো। পরে মৌর্যরা যখন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে, তখন একটি বিস্তৃত শাসনকাঠামো তৈরি হয়। বিলুপ্ত হয় গোত্রভিত্তিক শাসনকাঠামো। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে স্বাধীন রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর প্রায় ১০০ বছর বাংলায় কোনো সুনির্দিষ্ট আইন বা শাসন ছিল না। ফলে তৈরি হয়েছিল মাৎস্যন্যায় সমাজ জীবন। শক্তি যার সব তার, সে ইচ্ছা করলে ধর্ষণ করতে পারবে, মানুষ পিটিয়ে হত্যা করতে পারবে। এই অরাজকতা থেকে বাঁচতে বাংলার সামন্ত, বুদ্ধিমান সবাই মিলে একজন রাজা নির্বাচিত করলেন, যার নাম গোপাল। শুরু হলো পাল বংশের শাসন। মানুষ বুঝেছিল, শাসক যেমনই হোক, তার নির্দেশিত একটি গাইডলাইন না থাকলে সমাজে কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তখনো নিত্য নতুন সমস্যাকে সামনে রেখে স্থানীয় সমাজপতিরা তাদের নিয়ম-নীতি পালটাতেন। পরে সুলতানি ও মোগল আমলে ইসলামিক শরিয়া আইন অনুযায়ী বিচারকার্য ও শাসন পরিচালিত হতো। আর আমাদের বর্তমান আইনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ১৮৬০ সালে লর্ড মেকলের নেতৃত্বে ব্রিটিশ, ফরাসি আইনের আলোকে এবং স্থানীয় পরিবেশের দিকে দৃষ্টি রেখে। কিন্তু খোদ ব্রিটেনেই এখন আর ঊনবিংশ শতাব্দীর আইন নেই। কেমন পরিস্থিতিতে ব্রিটেনে আইনের পরিবর্তন হয় তার একটা মজার ঘটনা বলি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ সালের নভেম্বর মাসে ভূমধ্যসাগরে ঠিক মধ্যখানে একটি জার্মান ইউ-বোটের ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে ব্রিটিশ নেভির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস বারহাম ডুবে যায়। ফলে জাহাজটিতে থাকা ৮৬১ জন নৌসেনার প্রাণহানি ঘটে। এই খবর জানলে ব্রিটিশ জনগণের মনোবল ভেঙে যাবে, তাই ব্রিটিশ নেভি এই ঘটনার কথা পুরোপুরি চেপে যায় এবং কঠিনভাবে গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন পোর্টসমাউথ শহর ছিল ব্রিটিশ নৌসেনাদের উল্লেখযোগ্য ঘাঁটি। এই শহরেই বাস করতেন হেলেন ডানকান নামের এক নারী। তিনি জিন-পরি-ভূত হাজির করতে পারতেন এবং মৃত মানুষের আত্মা হাজির করতে পারেন বলে দাবি করতেন এবং অনেকে তা বিশ্বাস করত। আমাদের দেশে যেমন এখনো কিছু পির-ফকিরের জাদু-টোনা মানুষ বিশ্বাস করে। যাহোক, যুদ্ধজাহাজ ডুবির কয়েক দিন পর হেলেন মৃত মানুষকে হাজির করার একটি আসর বসালেন। অতি স্বল্প আলোর একটি ঘরে তিনি একজন মৃত নাবিকের আত্মাকে হাজির করলেন (তার দাবি অনুসারে)। বলা হলো, ঐ সেনা ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়া এইচএমএস বারহামে ছিলেন এবং তার সলিলসমাধি হয়েছে। হেলেনের দরবারে বা আসরে যারা উপস্থিত ছিল তারা দেখলেন ক্ষীণ আলোতে ইউনিফর্ম গায়ে, মাথায় মিলিটারি টুপি একটি অবয়ব এসে হাজির হলো এবং গুরুগম্ভীর স্বরে বলল, ‘মাই শিপ ওয়াজ সাংক অ্যান্ড আই ডাইড' অর্থাৎ ‘আমার জাহাজটি ডুবে গিয়েছিল এবং আমি মরে গেলাম।'

এই কাহিনি রয়াল নেভির কানে পৌঁছলে রীতিমতো শোরগোল পড়ে যায়। তাদের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা চলতে থাকে, এই মহিলা এটা জানল কী করে! রয়াল নেভি এবং গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৫ ধারণা করল, এই মহিলা যে করেই হোক নেভি সেনাদের আলোচনা শুনে ফেলেছে, অথবা কোনোভাবে ঘটনাটি কেউ তাকে বলে দিয়েছে। কারণ ভূতপ্রেত বা আত্মাকে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয় তখন আর ব্রিটিশ সরকার বিশ্বাস করে না।

কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। মিত্রশক্তি ১৯৪৪ সালে অপারেশন ওভারলর্ড-এর পরিকল্পনা করছে। নরম্যানডিতে নামবে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার হাজার হাজার সেনা। সেখানে অনেক সৈন্যের প্রাণহানি ঘটবে বলে আগে থেকেই আশঙ্কা ছিল। আর এই খবর ঐ নারী পেলে তা হবে ভীষণ বিব্রতকর। একজন ব্রিটিশ নাগরিককে তো আর সরকার ক্রসফায়ার দিতে পারে না। যতই যুদ্ধবিগ্রহ করুক, এমন কাজ ব্রিটেন ভুলে গেছে। ফলে কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেফতার করল ১৭৩৫ সালের Witchcraft Act-এ। এই আইনে বলা ছিল, কেউ যদি এমন ভান করে বা মানুষকে বোঝায় যে সে ভূত হাজির করতে পারে, বা আত্মা হাজির করতে পারে, তাহলে সেটা অপরাধ বলে গণ্য হবে। ঐ আইনে ডানকানকে ৯ মাস কারাদণ্ড এবং জনগণের সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়ার আদেশ জারি হলো। ডানকানকে আটকে রাখা হলো ১৯৪৪ সালে ডি-ডে অপারেশন সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত। বিষয়টি জানতে পেয়ে প্রধানমন্ত্রী চার্চিল এই রায়ে ক্ষুব্ধ হলেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে লিখলেন, এটি একটি সেকেলে বোকামি। আধুনিক যুগে এ ধরনের আইন থাকতে পারে না। ফলে ১৯৫১ সালে এই আইনটি পরিবর্তিত হয়ে Fraudulent Mediums Act পরিবর্তন করা হয়। Witchcraft Act বাতিল হয়ে গেল। এখন আসি মূল কথায়। বাংলাদেশে সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক আইন পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সমাজ দ্রুত বদলাচ্ছে। একটি উদাহরণ দিই।

বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এমনকি সরকারও এই সমস্যা নিয়ে রীতিমতো নাস্তানাবুদ। শত শত কিশোরকে দেশব্যাপী গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং আইনের প্যাচে আবার ছেড়েও দিতে হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশে ১৮ বছরের নিচের বয়সিদের কিশোর বলে বিবেচনা করা হয়। তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা দুরূহ। গুরুপাপে লঘুদণ্ড প্রদান করতে হয়। যার ফলে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে লাখ লাখ কিশোর। এখন থেকে ৩০ বছর আগে ১৬-১৭ বছর বয়সের যে ছেলেটি মা-বাবার ভয়ে একটি সিগারেট মুখে দিত না, বা সন্ধ্যার আগে বাড়ি না ফিরলে বাপের প্যাদানি খেতে হবে বলে ভয়ে ঘরে ফিরত, সেই বয়সের ছেলে এখন রাতের অন্ধকারে ডাকাতি করে, মায়ের বয়সি নারীকে ধরে নিয়ে একসঙ্গে কয়েক জন মিলে গণধর্ষণ করে। এ ধরনের অপরাধে জড়িত এক-দুজন না, সংখ্যাটা ভয়াবহ। একেকটি জেলায় পুলিশ ৪০০-৫০০ কিশোর অপরাধীকে ধরছে এবং সহজেই তারা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসছে। আর এই সুযোগটি অপরাধীরা গ্রহণ করে ১৮ বছরের নিচের শিশুদের যথেচ্ছা অপরাধে ব্যবহার করছে। যে বয়সের ছেলের ফ্রেশ, নিষ্পাপ মুখ দেখলে মানুষের মন ভরে উঠত, সেই বয়সের ছেলে একসঙ্গে কয়েক জনকে দেখলে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বিষয়টি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন দেশের স্বনামধন্য আইনবিদ, আইন সংস্কারক গাজী শামসুর রহমান। তাই তার মত ছিল—কিশোর অপরাধের বয়স কমিয়ে ১৬ বছর করার। কিন্তু কোনো সরকারই বিষয়টি আমলে নেয়নি জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভয়ে। দেশ তো আমাদের, এর সমাজব্যবস্থা এবং পরিস্থিতি আমাদেরই নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ইংল্যান্ডের বা আমেরিকার হিসাব কি বাংলাদেশে চলবে? ১৯৭৪ সালের শিশু আইনকে বাংলাদেশে ২০১৩ সালে এবং ২০১৮ সালে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু মূল জায়গায় শক্তভাবে রয়ে গেছে ‘১৮ বছরের নিচে সকলকে শিশু হিসাবে গণ্য করতে হবে!' পরিষ্কার উল্লেখ আছে, কোনোভাবেই শিশুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা বড় সাজা দেওয়া যাবে না। সর্বোচ্চ সাজা হবে ১০ বছর। আইন অনুযায়ী শিশুদের কারাগারে না রেখে সমাজকল্যাণের অধীনে সংশোধনাগারে রাখতে হবে। চার্চিলের ভাষায় এ আইন সেকেলে বোকামির মতোই। ১৭ বছর ১০ মাসের ছেলে কি শিশু? ২০১২ সালে ভারতে জ্যোতিসিংহ পাণ্ডে নামের মেডিক্যাল ইন্টার্নিকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেছিল কয়েক যুবক। প্রচণ্ড আলোড়ন তোলা এ ঘটনায় চার জনের ফাঁসির রায় হয়। কিন্তু যে ছেলেটি মেয়েটিকে ধর্ষণের পর তার গোপনাঙ্গে রড ঢুকিয়ে দেয়, যে কারণে মেয়েটিকে বাঁচানো যায়নি, সেই মোহাম্মদ আফরোজকে ২০১৫ সালে ছেড়ে দিতে হয়! কারণ তার বয়স ছিল ১৭ বছর ৬ মাস। তাই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরদের নতুন করে কিশোর অপরাধ নিয়ে ভাবতে অনুরোধ জানাই, অন্তত কিছু উপধারা প্রতিস্থাপনের।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন