বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস বিশ্ব অর্থনীতির সম্মুখে এক অস্বস্তিকর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করিতেছে। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, চলতি বৎসর বিশ্ববাজারে সামগ্রিক পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, কৃষ্ণসাগরে খাদ্যশস্য পরিবহনে বাধা এবং জলবায়ুর অনিশ্চয়তা মিলিয়া পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করিয়া তুলিতেছে।
প্রশ্ন হইল, এই মূল্যবৃদ্ধির বোঝা বহন করিবে কে? দ্রব্যমূল্য বাড়িলে সকল মানুষ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। উচ্চ আয়ের মানুষ ব্যয় সংকোচন করিয়া পরিস্থিতি সামলাইতে পারেন। মধ্যবিত্ত পরিবার সঞ্চয় ভাঙিয়া কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যয় কাটছাঁট করিয়া কিছুদিন চলিতে পারে; কিন্তু যাহাদের আয় যৎসামান্য, যাহাদের প্রতিদিনের উপার্জনের উপর নির্ভর করে পরদিনের আহার, তাহাদের সামনে বিকল্প কী? চাউল, ডাইল, তৈল, শাকসবজি কিংবা জ্বালানির মূল্য বাড়িলে তাহারা প্রথমে খাদ্যের পরিমাণ কমান, পরে পুষ্টির সহিত আপস করেন। একসময় চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যয়ও সংকুচিত করিতে বাধ্য হন। মূল্যস্ফীতি তখন মানুষের জীবনযাত্রার মান ও মর্যাদার উপর সরাসরি আঘাত হানে।
এই সংকটের আরো একটি বিপজ্জনক দিক রহিয়াছে। পণ্যের মূল্য বাড়িতেছে, অথচ সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়িতেছে না। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাইলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নূতন বিনিয়োগে সতর্ক হয়, ব্যবসায়ীরা নিয়োগ কমাইতে পারেন, ক্ষুদ্র উদ্যোগ টিকিয়া থাকিবার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি মন্থর হইলে শ্রমজীবী মানুষের দরকষাকষির ক্ষমতাও কমিয়া যায়। ফলে একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে আয় বৃদ্ধির অনিশ্চয়তা, দুইয়ের মধ্যবর্তী ব্যবধান ক্রমশ প্রশস্ত হয়। মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়। বাজারে পণ্য থাকিলেও তাহা ক্রয় করিবার সামর্থ্য সকলের থাকে না। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জ্বালানির মূল্য ৩২ শতাংশ এবং ধাতুর মূল্য ২৫ শতাংশ বাড়িতে পারে। চলতি বৎসর খাদ্যের মূল্য ১০ শতাংশের অধিক বাড়িলে আগামী বৎসর আরও ৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রহিয়াছে। অর্থাৎ খাদ্যনিরাপত্তার উপর চাপ দীর্ঘস্থায়ী হইতে পারে। পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল হইলে খাদ্যপণ্যের মূল্য পূর্বাভাসের তুলনায় ১২ শতাংশ অধিক বাড়িবার আশঙ্কা করিয়াছে বিশ্বব্যাংক। শক্তিশালী এল নিনো, যুদ্ধের বিস্তার এবং সরবরাহব্যবস্থার বিপর্যয় একত্রে ঘটিলে দরিদ্র দেশগুলিতে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বাড়িবে। অতীতে খাদ্যসংকট লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্যের গভীরে ঠেলিয়া দিয়াছে।
যদিও বিশ্বব্যাংক আগামী বৎসর সামগ্রিক পণ্যমূল্য ৭ শতাংশ কমিবার সম্ভাবনাও দেখাইয়াছে; কিন্তু এই পূর্বাভাসকে স্বস্তির নিশ্চয়তা বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। মূল্যহ্রাসের পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হইলেও বর্তমান উচ্চমূল্যের ভিত্তি হইতে মূল্য কতটা নামিবে, তাহা গুরুত্বপূর্ণ। মূল্য বৃদ্ধির গতি কমা এবং পূর্বের দামে ফিরিয়া যাওয়া এক কথা নহে। তদুপরি খাদ্য ও জ্বালানির মতো অপরিহার্য পণ্যের মূল্য দীর্ঘকাল উচ্চ থাকিলে নিম্ন আয়ের মানুষের সঞ্চয়, পুষ্টি ও জীবনযাত্রার উপর তাহার ক্ষতচিহ্ন থাকিয়া যায়। বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের সংকট অধিকতর গভীর। আমদানিনির্ভর অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতা, ঋণের বোঝা এবং দুর্বল সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারের অভিঘাত সামলাইবার ক্ষমতা কমাইয়া দেয়। বাংলাদেশের মতো দেশে জ্বালানি ও খাদ্যের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয় এবং নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ সৃষ্টি করিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে দরিদ্র মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর উদ্যোগ, কৃষি উৎপাদনে সহায়তা এবং বাজার তদারকির গুরুত্ব বাড়িয়া যায়। সাময়িক স্বস্তির ঘোষণার পরিবর্তে প্রয়োজন ধারাবাহিক ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা।
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নহে। যুদ্ধ বন্ধ, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। আগামী বৎসর বিশ্বের মানুষের জন্য কতটা কঠিন হইবে, তাহা নির্ভর করিবে মূল্যবৃদ্ধির গতিপ্রকৃতির পাশাপাশি ধারাবাহিক ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রস্তুতির উপর। আমরা কতখানি সেই ব্যাপারে প্রস্তুত?