এয়ারসাইডের নিরাপত্তায় শৈথিল্য কাম্য নহে

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩১

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার। কোনো রাষ্ট্রের বিমানবন্দর কেবল যাত্রী চলাচলের কেন্দ্র নহে, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব, সুরক্ষা এবং শৃঙ্খলার অন্যতম প্রতীক। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হইল, এই স্পর্শকাতর স্থানের সুরক্ষিত 'এয়ারসাইড' এলাকায় বর্তমানে যে চরম বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা দিয়াছে, তাহা কেবল উদ্বেগজনক নহে-দেশের অ্যাভিয়েশন খাতের জন্য এক বিরাট অশনিসংকেত।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, শাহজালালের রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে এবং অ্যাপ্রোন এলাকায় অবাধে শত শত যানবাহন চলাচল করিতেছে। অথচ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিকট এই সকল যানের কোনো ট্র্যাকিং তথ্য নাই। আধুনিক আকাশপথের নিরাপত্তায় ভেহিকল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) এক অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। বিশ্বের সর্বত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসমূহে যান্ত্রিক যানের প্রতিটি গতিবিধি কেন্দ্রীয়ভাবে নজরদারি করা হয়: কিন্তু শাহজালালে সেই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও এয়ারলাইনসসমূহের চরম উদাসীনতা ও নির্দেশ অমান্যের কারণে তাহার সুফল মিলিতেছে না বলিয়া জানা যায়। এইখানে কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানা হইবে না-এ কেমন কথা? তাহা হইলে কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব লইয়া কি প্রশ্ন উঠে না? ইহার পূর্বেও উপযুক্ত নজরদারির অভাবে রানওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকায় পুশকার্ট বা ট্রলির ধাক্কায় একাধিক উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হইবার ঘটনা ঘটিয়াছে। সৌভাগ্যবশত তাহা বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটায় নাই বটে; কিন্তু এই শিথিলতা বজায় থাকিলে অদূর ভবিষ্যতে যে বড় কোনো বিপর্যয় ঘটিবে না তাহার নিশ্চয়তা কোথায়? উড়োজাহাজের সামান্যতম ক্ষতিসাধন কিংবা রানওয়েতে যানের ভুল উপস্থিতি শত শত যাত্রীর জীবনকে এক মুহূর্তে বিপন্ন করিয়া তুলিতে পারে। কথায় বলে-সাবধানের মার নাই। তাই আগেভাগেই যত রকমের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় তাহা আমাদের গ্রহণ করিতে হইবে। সেফটি ফাস্ট বা নিরাপত্তাই প্রথম-এই কথা কেবল মুখে বলিলে হইবে না, বাস্তবে তাহা প্রয়োগ করিতে হইবে।

উল্লেখ্য, শাহজালাল বিমানবন্দরে অ্যাডভান্সড সারফেস মুভমেন্ট গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (এএসএমজিসিএস) এবং ভেহিকল ট্র্যাকিং সিস্টেম স্থাপন করা হইয়াছে। কন্ট্রোল টাওয়ারে প্রতিটি গাড়ির গতি, অবস্থান ও রুট রিয়েল টাইমে দৃশ্যমান করিবার সকল ব্যবস্থা রহিয়াছে; কিন্তু উড়োজাহাজগুলোর গ্রাউন্ড সাপোর্ট যান, ক্যাটারিং ও কার্গো ভ্যানগুলোয় পৃথক ট্র্যাকার না বসানোয় এই প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা নেওয়া যাইতেছে না। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারে কর্মরত নিয়ন্ত্রকরা রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রোন ও সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত কিংবা চলাচলরত বিমান ও অন্যান্য যান্ত্রিক যান শনাক্ত করিতে পারেন। যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে প্রয়োজনীয় শনাক্তকরণ প্রযুক্তি নির্মাণের সময় হইতেই সংযোজিত থাকে। তবে গাড়ি, বাস বা অন্য সেবা যান শনাক্ত করিতে সেগুলোর গায়ে বিশেষ ভেহিকল ট্র্যাকার স্থাপন করিতে হয়। এখন তাহা স্থাপনে কালক্ষেপণ করা হইতেছে এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশ বারংবার অমান্য করা হইতেছে যাহা দুঃখজনক। ১৫ জুন ২৩ সেপ্টেম্বরের পর শতভাগ গাড়িতে ভিটিএস সংযোজন সম্পন্ন করিয়া তালিকা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল গত ২৭ অক্টোবর: কিন্তু তাহাতেও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায় নাই। অগত্যা আবার সময়সীমা বাড়ানো হইয়াছে। এই বার টাইমলাইন ৭ ডিসেম্বর এবং ইহার পর ভিটিএস ব্যতিরেকে কোনো যান এয়ারসাইডে প্রবেশ করিতে না দেওয়ার কড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে বেবিচক, যাহা প্রশংসনীয় বটে।

বেবিচকের পক্ষ হইতে একাধিক বার সময়সীমা নির্ধারণ ও তাগিদপত্র প্রদান করা সত্ত্বেও দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসসমূহ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের ভিটিএস স্থাপনে যে গড়িমসি, তাহা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতারই পরিচায়ক। সরঞ্জাম আমদানির অজুহাত তুলিয়া জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলার অধিকার কাহারও নাই। বেবিচকের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং বিমানপোতের নিরাপত্তা সুনিশ্চিতকরণে আর কোনো প্রকার শিথিলতা বরদাস্ত করা অনুচিত। আমরা মনে করি, ইহার পর এইরূপ নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তাই থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধনে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির মিটিংয়ে গৃহীত সর্বশেষ সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। কেননা উড়োজাহাজের নিরাপদ চলাচল ও যাত্রীদের জীবন রক্ষায় এয়ারসাইডে সকল প্রকার যানের উপর নজরদারির কোনো বিকল্প নাই।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন