ডিজিটাল পরিসরেও নারী কেন নিরাপত্তাহীন থাকিবে?

একজন নারী ঘরের বাহিরে নিরাপত্তাহীন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীন, গণপরিবহনে নিরাপত্তাহীন। এখন দেখা যাইতেছে, ঘরে বসিয়া ইন্টারনেট ব্যবহার করিতেও তাহার নিরাপত্তা নাই। স্থান পরিবর্তিত হইয়াছে, অপরাধের হাতিয়ার পরিবর্তিত হইয়াছে, কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতার প্রবণতা একই রহিয়াছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও ডিজিটালি রাইটের যৌথ গবেষণায় প্রকাশিত তথ্য আমাদের সেই পুরাতন সামাজিক ব্যাধিরই এক নূতন ও উদ্বেগজনক চেহারা দেখাইতেছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী নারীদের ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ অনলাইনে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হইয়াছেন। সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই হার ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ ডিজিটাল পরিসরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বিপুলসংখ্যক নারীর সামনে নিরাপত্তার এক নূতন সংকট উপস্থিত হইতেছে।

এই গবেষণার পরিসংখ্যানের মধ্যে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ভুক্তভোগীদের ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক শোষণের শিকার। ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ আর্থিক প্রতারণার এবং ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ যৌন ও ছবিভিত্তিক নির্যাতনের শিকার হইয়াছেন। ফেসবুক ও মেসেঞ্জার এই অপরাধের প্রধান ক্ষেত্র। ব্যক্তিগত বার্তায় অশ্লীলতা, আপত্তিকর ছবি পাঠানো, ভুয়া পরিচয়ে সম্পর্ক গড়িয়া তোলা, ব্যক্তিগত ছবি সংগ্রহ করিয়া ব্ল‍্যাকমেল এবং সম্মতি ছাড়া ছবি ছড়াইয়া দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিতেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার এই অপরাধকে আরো ভয়ংকর করিয়া তুলিয়াছে। এখন কোনো নারীর মুখাবয়ব ব্যবহার করিয়া অশ্লীল ছবি বা ভিডিও তৈরি করিতে অপরাধীর বিশেষ দক্ষতারও প্রয়োজন হয় না। কয়েকটি প্রযুক্তিগত সরঞ্জামই যথেষ্ট। ব্যক্তির সম্মানহানি করিবার এই সহজলভ্য উপায় নিঃসন্দেহে এক গভীর সামাজিক বিপদের ইঙ্গিত বহন করে। তবে গবেষণার সবচাইতে বেদনাদায়ক দিক সম্ভবত অপরাধের সংখ্যা নহে, প্রতিকারের অভাব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ জানাইয়াও ৫৬ শতাংশ নারী কোনো প্রতিকার পান নাই। পুলিশের কাছে গিয়াছেন মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ভুক্তভোগীদের ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ অপরাধীকে ব্লক করিয়াছেন, ২১ শতাংশ ভয়ের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার কমাইয়া দিয়াছেন। কেহ কেহ পড়াশোনা, চাকরি এমনকি বাসস্থান পরিবর্তন করিতে বাধ্য হইতেছেন। অর্থাৎ অপরাধী অনলাইনে একটি ছবি বা বার্তা ছড়াইয়া দিতেছে, আর তাহার পরিণামে ভুক্তভোগী নারী বাস্তব জীবনের পরিচিত পরিবেশ ছাড়িয়া যাইতে বাধ্য হইতেছেন। অপরাধী থাকিতেছে নিজ স্থানে, অথচ পালটাইতে হইতেছে নির্যাতিতের জীবন!

এই অসহায়ত্বের নেপথ্যে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও বড় ভূমিকা রহিয়াছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ নারী মনে করেন, অনলাইনে নির্যাতনের শিকার হইলে সমাজে ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয়। ব্যক্তিগত ছবি কীভাবে অপরাধীর হাতে গেল, কেন অপরিচিত ব্যক্তির সহিত যোগাযোগ করিলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেন সক্রিয় ছিলেন-এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হইতে হয় তাহাদের। অথচ অপরাধের শতভাগ দায় অপরাধীর। এই সরল সত্যটি সমাজে প্রতিষ্ঠিত না হইলে কোনো আইনই ভুক্তভোগীকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারিবে না। দুঃখজনকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা ভীষণ দুর্বল।

স্পষ্টতই, এই সকল প্রতিষ্ঠানের নিকট অভিযোগ জানাইবার পদ্ধতি সহজ করিতে হইবে। শর্তাবলি ও অভিযোগের প্রক্রিয়া বাংলায় উপস্থাপন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি, ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ এবং অপরাধী অ্যাকাউন্ট শনাক্তকরণে কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে থাকা অপরাধী শনাক্ত, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং এআই-নির্ভর অপরাধের তদন্তে বিশেষ প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। প্রতিটি থানায় এই ধরনের অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য গোপনীয়তা রক্ষাকারী সহায়তা নিশ্চিত করিবার ব্যবস্থা কি এই যুগে অপরিহার্য নহে? পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারে ডিজিটাল নিরাপত্তার শিক্ষা দিতে হইবে।

ইন্টারনেট এখন শিক্ষা, জীবিকা, যোগাযোগ ও মতপ্রকাশের অপরিহার্য মাধ্যম। এই মাধ্যম ব্যবহার করিবার কারণে কোনো নারীকে যদি নিজের সম্মান, নিরাপত্তা কিংবা স্বাভাবিক জীবন বিসর্জন দিতে হয়, তাহা হইলে সেই ডিজিটাল অগ্রগতি লইয়া আমরা কী করিব? নারীস্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত বিষয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি।