কবি বলিয়াছেন— ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে'। ইহাকে এই যুগে নূতন করিয়া লিখিতে হইবে—গাছ ঢাকিয়া যায় বিজ্ঞাপনে। গাছের গায়ে পেরেক ঠুকিয়া বিজ্ঞাপন, ব্যানার, ফেস্টুন কিংবা বিলবোর্ড টাঙানোর দৃশ্য আমাদের দেশে এতটাই পরিচিত যে, ইহা লইয়া কাহারও বিশেষ মাথাব্যথা আছে বলিয়া মনে হয় না। অথচ একবার ভাবিয়া দেখা প্রয়োজন, যেই গাছটি আমাদের ছায়া দেয়, অক্সিজেন জোগায়, বায়ুদূষণ কমায়, পাখিদের আশ্রয় দেয়, সেই গাছটির বুকেই আমরা নির্দ্বিধায় লোহার পেরেক বিদ্ধ করিতেছি। সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, নাটোরের বাগাতিপাড়া, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ, জয়পুরহাটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গাছের গায়ে পেরেক ঠুকিয়া বিজ্ঞাপন ও প্রচারসামগ্রী টাঙানো হইতেছে। কোথাও হাসপাতাল, ক্লিনিক, কোচিং সেন্টার ও ব্যবসায়প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন, কোথাও রাজনৈতিক নেতাদের শুভেচ্ছাবার্তা, আবার কোথাও সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচনি প্রচারণা। বিশেষত নির্বাচন কিংবা জাতীয় দিবস আসিলে গাছের উপর এই অত্যাচার বাড়িয়া যায়। সমগ্র দেশেই, গত ১০-১২ বৎসরে এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে। নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্থানে বহু গাছ ইতিমধ্যে শুকাইয়া মরিয়া গিয়াছে। কোনো কোনো গাছ অর্ধমৃত অবস্থায় দাঁড়াইয়া আছে। গাছেরও যে প্রাণ রহিয়াছে, তাহা বিজ্ঞান বহু পূর্বেই প্রমাণ করিয়াছে। গাছের কাণ্ডে পেরেক ঠুকিলে বাকল ও অভ্যন্তরীণ জীবন্ত টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাইলেম ও ফ্লোয়েমের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন টিস্যুর ক্ষতি হইতে পারে। ক্ষতস্থান দিয়া রোগজীবাণু, ছত্রাক ও ক্ষতিকর অণুজীব প্রবেশের আশঙ্কা থাকে। বারবার পেরেক ঠুকিলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, এমনকি গাছটির মৃত্যুও ঘটিতে পারে। মানুষের সামান্য প্রচারের সুবিধার জন্য একটি জীবন্ত বৃক্ষকে এইভাবে বিপন্ন করিবার অধিকার কাহারো নাই।
ইহার আরেকটি দিক হইল দৃশ্যদূষণ। রাস্তার দুই ধারে সারি সারি গাছের সবুজ সৌন্দর্য পথচারীর মনকে স্বস্তি দেয়। সেই গাছের গায়ে যখন বিচিত্র রঙের টিন, প্লাস্টিকের বোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন ঝুলিতে থাকে, তখন প্রকৃতির সৌন্দর্য ঢাকা পড়িয়া যায়। কোথাও গাছের কাণ্ড দেখা যায় না, দেখা যায় কেবল বিজ্ঞাপনের জঞ্জাল। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের গাছেও আপত্তিকর বিজ্ঞাপন ঝুলিতে দেখা গিয়াছে। যেই বিজ্ঞাপন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার কথা, তাহাই শেষ পর্যন্ত জনজীবনের চোখের পীড়া হইয়া দাঁড়ায়। বিস্ময়ের বিষয় হইল, গাছের ক্ষতিসাধন বন্ধ করিবার জন্য আইন রহিয়াছে। বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন, ২০২৬-এর ৯(১৩) ধারায় বাণিজ্যিক উৎপাদন ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে পেরেক বা ধাতব বস্তু দ্বারা বৃক্ষের ক্ষতিসাধন নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। আইন অমান্য করিলে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধানের কথাও সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের কর্মকর্তা জানাইয়াছেন। অথচ বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই এই আইন অমান্য করা হইতেছে। প্রশাসনের পক্ষ হইতে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাসও পাওয়া যায়; কিন্তু আশ্বাসের পর বাস্তবে কতখানি কাজ হয়, তাহার নমুনা আমরা দেশ জুড়িয়াই দেখিতে পাই। এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল, নির্বাচনি প্রার্থী, ব্যবসায়ী ও বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলির দায়িত্বও কম নহে। যাহারা জনপ্রতিনিধি হইতে চাহেন, তাহাদের প্রচারেই যদি গাছের ক্ষতি হয়, তাহা হইলে তাহারা পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার কতটা পালন করিবেন? একটি হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান মানুষের জীবন রক্ষার কথা বলে। সেই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন যদি জীবন্ত গাছের ক্ষতির কারণ হয়, তাহা হইলে তাহাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা লইয়াও প্রশ্ন উঠিবে।
আমরা মানুষ বলিয়া প্রকৃতির উপর আমাদের একচ্ছত্র অধিকার জন্মায় নাই। গাছ কথা বলিতে পারে না, প্রতিবাদ করিতে পারে না। তাই তাহার শরীরে ইচ্ছামতো পেরেক ঠুকিবার অধিকার আমাদের নাই। আজ যে গাছটির বুকে বিজ্ঞাপনের বোর্ড ঝুলিতেছে, কাল হয়তো সেই গাছটি শুকাইয়া মরিয়া যাইবে। হারাইয়া যাইবে একটি অক্সিজেন-কারখানা, পরিবেশ রক্ষাকারী একটি সবুজ প্রাণ। এই সামান্য সত্যটুকু উপলব্ধি করিবার মতো বোধ কি আমাদের ভিতর হইতে লুপ্ত হইয়াছে?