বাংলাদেশের আরো বেশি চীনা ভাষা শিক্ষার্থী কেন প্রয়োজন

৮৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আমি চীনা ভাষা শেখার উদ্দেশ্যে বেইজিং ১৯ যাই । তখন আমি ভর্তি হই বেইজিং ল্যাংগুয়েজ ইনস্টিটিউটে, যা বর্তমানে বেইজিং ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড কালচার ইউনিভার্সিটি (BLCU) নামে পরিচিত। অনেক তরুণ শিক্ষার্থীর মতো আমিও জ্ঞান অর্জন এবং একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলাম। কিন্তু তখন বুঝতে পারিনি যে, চীনা ভাষা শিক্ষা শুধু আমার পেশাগত জীবনকেই প্রভাবিত করবে না, বরং বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগও করে দেবে।

প্রায় চার দশক পর আজও আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, বাংলাদেশে চীনা ভাষা শিক্ষার প্রতি আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শুধু এই কারণে নয় যে, চীন আজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি; বরং এ কারণে যে, চীনা ভাষা আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।

চীনে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছাত্রজীবনে আমি এমন একটি সভ্যতাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাই, যার রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়নের প্রতি অসাধারণ অঙ্গীকার । ১৯৮৮ সালের সেই প্রথম সফরের পর আমি বহুবার চীন ভ্রমণ করেছি এবং উত্তরাঞ্চলের হারবিন থেকে দক্ষিণের হাইনান পর্যন্ত ২০০- এরও বেশি শহরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি । ফলে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূ পান্তরকে আমি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করতে পেরেছি। চীনা জনগণের আন্তরিকতা E সৌহার্দ্যও আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। অধ্যাপক, শিক্ষার্থী, সরকারি কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা কিংবা সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতায় আমি সব সময় বাংলাদেশের প্রতি তাদের আগ্রহ এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক বন্ধুত্ব গড়ে তোলার আন্তরিকতা লক্ষ করেছি। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে, অর্থবহ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শুধু সরকার ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের মাধ্যমেও গড়ে ওঠে।

চীনা ভাষা আমার পেশাগত জীবনের গতিপথও বদলে দিয়েছে। ২০০১-২০০২ সালে বাংলাদেশ ও চীনের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলগুলোর বৈঠকে দোভাষী হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে উপলব্ধি করিয়েছে যে, দোভাষীর কাজ শুধু ভাষান্তর নয়; বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করা, ভুল বোঝাবুঝি কমানো এবং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে আস্থা গড়ে তোলা। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে কর্মরত শত শত চীনা পেশাজীবী এবং চীন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান খুঁজতে থাকা অসংখ্য বাংলাদেশির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—ভাষা এখনো আমাদের দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোর একটি।

বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীনের সহযোগিতা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ নানা ক্ষেত্রে বিস্তৃত। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা যত বাড়ছে, ততই চীনা ভাষায় দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবীদের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুঃখজনকভাবে, এই চাহিদার তুলনায় দক্ষ মানবসম্পদের সরবরাহ এখনো সীমিত । একজন শিক্ষক, দোভাষী ও ভাষা প্রশিক্ষক হিসেবে আমি দেখেছি, অনেক মেধাবী বাংলাদেশি শুধু চীনা ভাষাজ্ঞানের অভাবে মূল্যবান সুযোগ হারিয়েছেন। অন্যদিকে, অনেকেই চীনা ভাষা শেখার মাধ্যমে নিজেদের জীবন ও
কর্মজীবনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন।

২০০৮ সাল থেকে আমি বিভিন্ন পর্যায়ে চীনা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছি। এই সময়ে শ্রেণিকক্ষ, অনলাইন প্ল্যাটফরম এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে হাজারো শিক্ষার্থীকে চীনা ভাষা শেখানোর সুযোগ হয়েছে। আমার অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী বর্তমানে দোভাষী, অনুবাদক, প্রকৌশলী, গবেষক, নাবিক, ব্যবস্থাপক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হিসেবে সফলভাবে কাজ করছেন। কেউ কেউ চীনে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি পেয়েছেন, আবার কেউ চীনা ভাষাজ্ঞানের কারণে ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন । একজন শিক্ষকের জন্য সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোর একটি হলো—যখন কোনো প্রাক্তন শিক্ষার্থী জানায়, 'স্যার, চীনা ভাষা শেখা আমার জীবন বদলে দিয়েছে।' এমন বার্তাগুলো আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, ভাষা শিক্ষা ব্যক্তি ও জাতীয় উন্নয়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে ।

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে চীনা ভাষা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে, যা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক । এখন অনেক শিক্ষার্থী উপলব্ধি করছেন যে, চীনা ভাষাজ্ঞান উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক ব্যবসা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণা সহযোগিতা এবং কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। তবে ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক চীনা ভাষা শিক্ষার সুযোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়। বাংলাদেশ যখন একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন চীনা ভাষাসহ ব্যাবহারিক বিদেশি ভাষা শিক্ষার ওপর আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্রগুলো এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা আরো সম্প্রসারিত হলে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।

ভাষা শিক্ষা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে—এটি পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি করে। অবকাঠামো প্রকল্প ও বাণিজ্যিক চুক্তি রাষ্ট্রগুলোর আনুষ্ঠানিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে মানুষের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশিরা যখন চীনা ভাষা শেখে এবং চীনারা যখন বাংলাদেশ সম্পর্কে আরো জানার সুযোগ পায়, তখন পারস্পরিক আস্থা বাড়ে, ভুল ধারণা কমে এবং সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয় ।

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর নির্ভর করবে না; বরং শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার ওপরও নির্ভর করবে। ১৯৮৮ সালে বেইজিংয়ে আমার প্রথম আগমনের দিনটির দিকে ফিরে তাকালে আমি গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করি। চীনা ভাষা আমাকে দোভাষী, শিক্ষক, লেখক এবং সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধের একজন কর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি আমাকে প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ দিয়েছে কীভাবে একটি ভাষা মানুষ, সংস্কৃতি এবং জাতিকে একসূত্রে গাঁথতে পারে।
আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি বিদেশি ভাষা শেখার আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভাষা জ্ঞান, বন্ধুত্ব, পেশাগত সুযোগ এবং অন্য একটি মহান সভ্যতাকে গভীরভাবে জানার সেতুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ যখন বিশ্বের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছে এবং চীনের সঙ্গে অংশীদারত্ব আরো গভীর করছে, তখন চীনা ভাষা শিক্ষায় বিনিয়োগ আগামী প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী বিনিয়োগগুলোর একটি হতে পারে ।

লেখক : উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (WSCCBL)- এর সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনাল ল্যাংগুয়েজের অ্যাডজাংকক্ট প্রফেসর