খাদ্য শুধু জীবনের উপকরণ নয়, মানবাধিকারেরও ভিত্তি। খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপকরণ। কিন্তু খাদ্যের গুরুত্ব কেবল ক্ষুধা নিবারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সুস্থতা, শারীরিক বৃদ্ধি, মেধার বিকাশ, কর্মক্ষমতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গেও খাদ্যের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। একটি জাতির স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করে সেই জাতির মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করার ওপর। অথচ একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতেও কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধা, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যের উচ্চমূল্যের কারণে মানবিক সংকটের মুখোমুখি। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং কৃষি উৎপাদনের উন্নতি সত্ত্বেও বিশ্বে ক্ষুধা ও অপুষ্টি এখনো
গুরুতর সমস্যা। FAO-এর ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পৃথিবীর আনুমানিক ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার সম্মুখীন হয়েছিল, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রায় ২১০ কোটি মানুষ মাঝারি বা গুরুতর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। অর্থাৎ, বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত ও নিরাপদ খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত।
বিশ্বের খাদ্যসংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ক্রয়ক্ষমতা | FAO- এর ২০২৬ সালের The State of Food Security and Nutrition in the World প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে আনুমানিক ২৭০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য থেকে বঞ্চিত হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল উৎপাদন বাড়ানোর প্রচলিত কৌশল যথেষ্ট নয়। খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরো দক্ষ, সাশ্রয়ী, সহনশীল ও পুষ্টিকেন্দ্রিক করে তুলতে হবে। আর সে লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম উপায় হলো উদ্ভাবন। উদ্ভাবন বলতে শুধু নতুন যন্ত্র আবিষ্কার বা আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনকে বোঝায় না। কোনো সমস্যার কার্যকর সমাধানে নতুন চিন্তা, উন্নত পদ্ধতি, উপযোগী প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা কিংবা প্রচলিত জ্ঞানের সৃজনশীল প্রয়োগও উদ্ভাবনের অন্তর্ভুক্ত। কৃষিতে উন্নত বীজের ব্যবহার, সেচের পানির সাশ্রয়, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ফসলের রোগ শনাক্তকরণ, খাদ্য সংরক্ষণের উন্নত পদ্ধতি, ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন—সবই খাদ্যব্যবস্থার উদ্ভাবনের উদাহরণ। তবে উদ্ভাবনের সাফল্য নির্ভর করে তা মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান করছে কি না, তার ওপর। কোনো প্রযুক্তি যদি কেবল বড় কৃষিপ্রতিষ্ঠানের উপকার করে কিন্তু ক্ষুদ্র কৃষককে আরো পিছিয়ে দেয়, তাহলে সেটিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবন বলা যায় না। একইভাবে প্রযুক্তির কারণে উৎপাদন বাড়লেও যদি পরিবেশের ক্ষতি হয় কিংবা দরিদ্র মানুষের খাদ্যের দাম বেড়ে যায়, তাহলে সেই উদ্ভাবনের সুফল সীমিত থেকে যায়। খাদ্যনিরাপত্তার মূল লক্ষ্য শুধু মানুষের পেটে খাবার পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা। খাদ্যের পরিমাণের পাশাপাশি গুণমানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভবতী নারী, শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং প্রবীণদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
FAO ও অন্যান্য জাতিসংঘ সংস্থার ২০২৫ সালের যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সি প্রায় ১৫ কোটি ২০ লাখ শিশু খর্বাকৃতির সমস্যায় ভুগছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে শুধু মায়ের দুধ পান করার হার ২০১২ সালের ৩৭ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৪৭.৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। এ অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক হলেও বিশ্বব্যাপী শিশুপুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো অনেক কাজ বাকি। পুষ্টি উন্নয়নে উদ্ভাবনের নানা সুযোগ রয়েছে। ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ ফসলের জাত উদ্ভাবন, আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের মতো পুষ্টি উপাদান দিয়ে নির্দিষ্ট খাদ্য সমৃদ্ধ করা, সহজলভ্য পুষ্টিকর খাবার তৈরি এবং পুষ্টি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এর অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে চাল প্রধান খাদ্য হলেও সুষম খাদ্যের জন্য ডাল, মাছ, ডিম, দুধ, শাকসবজি, ফল এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারও প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের সহজলভ্যতা বাড়াতে পারলে পুষ্টিহীনতা মোকাবিলা করা সহজ হবে।
খাদ্যনিরাপত্তায় পারস্পরিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন। ক্ষুধা ও অপুষ্টি কোনো একটি দেশের একক সমস্যা নয়। যুদ্ধ, সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিঘ্ন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগের প্রভাব দেশের সীমানা অতিক্রম করে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে কৃষিপ্রযুক্তি বিনিময়, গবেষণা সহযোগিতা, দুর্যোগ মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ এবং খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়ানোর কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
লেখক : ফিকামলি তত্ত্বের জনক; বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
