যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং বিশ্বরাজনীতির নূতন সমীকরণ

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি বড় ঘটনা। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার মধ্য দিয়া মার্কিন ভোটাররা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাসনপদ্ধতি ও নীতির প্রতি গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করিয়াছেন । সিএনএনের প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, সিনেটে সাতটি আসন রিপাবলিকানদের নিকট হইতে ছিনাইয়া লইয়াছে ডেমোক্র্যাটরা। টেক্সাস, জর্জিয়া, ওহাইও ও আইওয়ার মতো রিপাবলিকান প্রভাবিত অঙ্গরাজ্যেও গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে । বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই নির্বাচনের গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সীমানায় আবদ্ধ থাকিবে না। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির অধিকারী দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটিলে তাহার অভিঘাত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, যুদ্ধ, বাণিজ্য, জ্বালানি ও কূটনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পড়িবে। প্রশ্ন হইল, এই পরিবর্তন বিশ্ববাসীর জন্য কতখানি স্বস্তির, আর কতখানি উদ্বেগের?

ভোটারদের অসন্তোষের কেন্দ্রে ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়, ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্পের শুল্কনীতি। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের জরিপে ৮৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করিয়াছেন, ইরান যুদ্ধ জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াইয়াছে। ৬৮ শতাংশের মতে, এই যুদ্ধ লড়িবার প্রয়োজন ছিল না । অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত যখন সাধারণ মানুষের সংসারের হিসাবকে বিপর্যস্ত করে, তখন তাহার রাজনৈতিক মূল্যও দিতে হয়। ইহা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নহে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের শাসকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা । কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইরান যুদ্ধের বিষয়ে প্রশাসনের উপর নজরদারি ও জবাবদিহির সুযোগ বাড়াইবে। সামরিক ব্যয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে যুদ্ধের অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত করিবার রাজনৈতিক ক্ষমতা ও তাহাদের থাকিবে । ইহা মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক সমঝোতা ও যুদ্ধবিরতির পথ প্রশস্ত করিতে পারে । ইউরোপীয় মিত্রদের উপর ট্রাম্পের একতরফা চাপ কমিবার সম্ভাবনাও রহিয়াছে; কিন্তু বিপরীত আশঙ্কাটিও উড়াইয়া দেওয়া যায় না । অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোণঠাসা হইয়া ট্রাম্প যদি নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় আরো মরিয়া হইয়া উঠেন, তাহা হইলে কংগ্রেসের বাধা এড়াইতে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করিয়া নূতন সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারেন ।
ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রহিয়াছে। ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কিছু রিপাবলিকান সদস্যের সমর্থনে ইউক্রেনের জন্য নূতন সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদিত হইতে পারে । ইহা ইউক্রেন ও ইউরোপের জন্য ইতিবাচক । তবে ইউক্রেনকে কেন্দ্র করিয়া মার্কিন রাজনীতিতে দলীয় বিভাজন বাড়িলে সহায়তার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হইতে পারে । ইউরোপীয় দেশসমূহেও তাই ওয়াশিংটনের নীতির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিতে চাহিবে না। এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলিয়াছে । ফল প্রকাশের পর মার্কিন শেয়ার বাজারের ফিউচার্স প্রায় ১ শতাংশ বাড়িয়াছে, ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমিয়াছে এবং ডলারের মান কিছুটা দুর্বল হইয়াছে । বিনিয়োগকারীদের ধারণা, বিভক্ত সরকার অতিরিক্ত ঋণ ও সরকারি ব্যয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করিতে পারিবে; কিন্তু বাণিজ্যযুদ্ধের অবসান ঘটিবার সম্ভাবনা ক্ষীণ । ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ির উপর আরোপিত শুল্ক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কার্যকর হওয়ায় কংগ্রেসের পক্ষে সহজে তাহা প্রত্যাহার করা সম্ভব নহে। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা থাকিয়াই যাইবে ।
এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হইল—গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ভারসাম্য । তবে প্রেসিডেন্ট তথা হোয়াইট হাউজ ও কংগ্রেসের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে অচলাবস্থাও তৈরি হইতে পারে। তাহার প্রভাব পড়িতে পারে মিত্র দেশসমূহের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও। সার্বিকভাবে, এই নির্বাচনে মার্কিন ভোটাররা ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরাইবার একটি সুযোগ সৃষ্টি করিয়াছেন বটে। তবে ট্রাম্পের হাতে এখনো প্রেসিডেন্সিয়াল ভেটো ও নির্বাহী ক্ষমতা রহিয়াছে। সুতরাং পরবর্তী দুই বৎসর ইহাই দেখিবার বিষয় যে, ওয়াশিংটনের এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনিবে, নাকি আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তাকে আরো সংকটাপন্ন করিবে ।