খুলনা-বাগেরহাট সফরে প্রধানমন্ত্রী

আমাদের লক্ষ্য বন্ধ হওয়া কল-কারখানাগুলো ফের চালু করা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, যারা বিগত ১৫-১৬ বছরে দেশের অবস্থার, মানুষের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারেনি, যারা মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, যারা এদেশ থেকে মানুষের অর্থ-সম্পদ বিদেশে পাচার করে দিয়েছিল, আমরা দেখেছি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে জনতার অভ্যুত্থানে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। আজ তারা সীমান্তের ওপার থেকে কলকাঠি নাড়াচ্ছে। দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। শুধু তাই নয়, তারা দেশের মিল কারখানা ভেঙে দিতে চাচ্ছে। দেশের শিল্পকারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তাদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে উচিত জবাব দেবে। আমরা সকল শক্তি নিয়ে দেশের মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ ও শ্রমিক ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের রুখে দাঁড়াব। ২০২৪ সালে যেভাবে বাংলাদেশের মানুষ তাদের উচিত জবাব দিয়েছিল, সামনের দিনেও একইভাবে তাদের উচিত জবাব দেওয়া হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বাগেরহাটে হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতে যাওয়ার পথে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের কাটাখালী মোড়ে আয়োজিত এক বিরাট পথসভায় তিনি এ কথা বলেন। পথসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী ঐতিহাসিক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। এ সময় মহাসড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাত মেলান এবং কুশল বিনিময় করেন তিনি। হাজার হাজার নেতাকর্মী সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান।

এর আগে সকালে হেলিকপটারযোগে মোংলায় পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী মোংলায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) মধ্যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে তিনি খুলনায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস (সিজন-২)-এর উদ্বোধন করেন। পরে বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে হেলিকপটারযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে খুলনা ত্যাগ করেন।

কাটাখালীর পথসভায় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আজ যেহেতু জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাই জনগণের সরকার দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে। দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আর সেটিকে এই যড়যন্ত্রকারীরা ভেস্তে দিতে চাইছে। এসব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আজ জনগণকে রুখে দাঁড়াতে হবে। এই দেশের শ্রমিক ভাইদের রুখে দাঁড়াতে হবে, যাতে কোনোভাবেই সেই ষড়যন্ত্রকারীরা সুযোগ না পায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সকল শক্তি দিয়ে এই ষড়যন্ত্রকারীদের জবাব দেব। আমরা সকল শক্তি দিয়ে খেটে খাওয়া মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, শ্রমিক ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে  এই ষড়যন্ত্রকারীদের জবাব দেব। আমাদের সামনে লক্ষ্য একটাই, সেটা হলো ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিল কারখানাগুলো হচ্ছে দেশের মানুষের সম্পদ। শ্রমিকদের সম্পদ। এগুলো যদি ধ্বংস হয়ে যায় প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমার শ্রমিক ভাই ও বোনরা।

মজুরি বোর্ড প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জানি শ্রমিক ভাই-বোনদের মজুরি নিয়ে কিছু দাবি-দাওয়া আছে। আপনারা দেখেছেন এরই মধ্যে আমরা সেই দাবিগুলো বিবেচনা করার জন্য, পরিচালনা করার জন্য

মজুরি বোর্ড গঠন করেছি। বোর্ড এরই মধ্যে কাজও শুরু করে দিয়েছে। আগামী ২/১ মাসের মধ্যে মজুরি বোর্ড নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করবে।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার রাত-দিন পরিশ্রম করছে। কীভাবে দেশের সমস্যার সমাধান করা যায়, কীভাবে দেশের শিল্পের প্রসার ঘটানো যায়, কীভাবে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য জোরদার করা যায় যাতে করে দেশের মানুষ ভালো থাকতে পারে সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি দেশের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি-বেসরকারি শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উত্সাহিত করে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছিল। আমরা চেষ্টা করব সারা দেশে বিভিন্ন সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া মিল কলকারখানাগুলো চালু করতে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের তরুণ ও যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একসময় খুলনা ছিল দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে নানা কারণে এ অঞ্চলের অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার খুলনা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তরের পঞ্চগড় পর্যন্ত হাজার হাজার শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চায়।

সকালে মোংলায় ‘মোংলা বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ করা হলে এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি সম্ভাবনাময় নতুন অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হবে। সকালে প্রধানমন্ত্রী ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণ এবং আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ জোরদার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ সম্ভব হবে। একই সঙ্গে খানজাহান আলী বিমানবন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রম চালু করাও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, ইয়ার্ড ও কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে এসব কাজ সম্পন্ন হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে এবং সারা দেশের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। তিনি বলেন, প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুধু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বন্দরসেবার মান কতটা উন্নত হলো, পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কতটা কমল, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল এবং পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকল, তার ওপরই প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে।

প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে বিনিয়োগে আন্তর্জাতিক অংশীজন, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্দরের নাব্যতা, নৌ চ্যানেলের নির্ভরযোগ্যতা, জাহাজের নিরাপদ চলাচল এবং প্রতিযোগিতামূলক বন্দরসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে মোংলা বন্দরকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে উপযুক্ত বাণিজ্যিক ও পরিচালনাগত শর্তে এটিকে ফার্স্ট কলিং পোর্ট হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তিনি আরো বলেন, মোংলা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।

মানলেন না প্রটোকল, জনগণের সঙ্গে গেলেন প্রধানমন্ত্রী

বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুলনা প্রবেশের সময় রূপসা উপজেলার তিলক কুদির বটতলায় প্রটোকল ভেঙে মিশলেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। নিঃসংকোচে হাত মেলালেন সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে।

গতকাল প্রধানমন্ত্রী খুলনা সফর উপলক্ষ্যে খুলনা মহানগরীর প্রবেশদ্বার রূপসা উপজেলার তিলক কুদির তলায় নির্মিত হয় পথসভা মঞ্চ। তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে মঞ্চে নেওয়ার জন্য গঠিত হয় তিন সদস্যের টিম। প্রধানমন্ত্রী আসার পূর্বেই ঐ তিন জন মঞ্চের সামনে অপেক্ষা করতে থাকেন। দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বাস এসে থামে পথসভা মঞ্চের পাশে। অভ্যর্থনায় দায়িত্বে থাকা নেতৃবৃন্দ তার কাছে পৌঁছানোর আগেই গাড়ি থেকে নেমে প্রধানমন্ত্রী মিশে যান সাধারণ মানুষের সঙ্গে। কোনো প্রটোকল না মেনে জনগণের সঙ্গে হাত মেলাতে থাকেন। তার এই আচরণে আনন্দে উদ্বেলিত হয় দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। পথসভা স্থলে উপস্থিত অনেককেই বলতে শোনা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন প্রধানমন্ত্রী এই প্রথম।

খুলনার আইনশৃঙ্খলাপরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস

গতকাল বিকালে খুলনা মহানগরীর ডাকবাংলা মোড়ে আকস্মিক এক পথসভায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। সফরসূচিতে না থাকলেও বিএনপি নেতাদের অনুরোধে এ পথসভায় যোগ দেন তিনি। সেখানে তিনি বলেন, খুলনার বন্ধ শিল্পকারখানা দ্রুত চালু করে শিল্পাঞ্চলের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান সমস্যা সমাধান করা সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে আছে।  বিকাল ৩টা ২১ মিনিটে তাকে বহনকারী ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বাসটি ডাকবাংলা মোড় অতিক্রম করার সময় খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন পথসভা মঞ্চ থেকে তাকে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বাস থেকে নেমে খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সামনে নির্মিত মঞ্চে যান। এ সময় তিনি প্রটোকল ভেঙে বাস থেকে নেমেই সোজা হেঁটে যান জনতার দিকে। হাত বাড়িয়ে দেন কর্মীদের দিকে। প্রধানমন্ত্রীর আগে একই মঞ্চে বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল। তিনি খুলনার সার্বিক উন্নয়ন ও সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। আরো বক্তব্য দেন খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু।