যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার মধ্যেই গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা ও গুলিবর্ষণে এক শিশুসহ অন্তত চার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হামলায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে হাসপাতাল ও চিকিৎসাসূত্র জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ভোর থেকে উপত্যকার মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে এসব হামলার ঘটনা ঘটে।
দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আজ-জাওয়াইদার পশ্চিম অংশে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের একটি তাঁবু লক্ষ্য করে ড্রোন থেকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এতে ২৭ বছর বয়সী আবদুল রহিম ওয়ালিদ মাতার নিহত হন।
এদিকে খান ইউনিসে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার বাইরে গুলিবর্ষণে এক নারী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুজন বলে জানিয়েছে নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্স। একই সময়ে বুরেজ শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে আল-আউদা হাসপাতাল।
দেইর আল-বালাহ থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক আশরাফ আমরা জানান, পূর্ব বুরেজে বাড়িঘর ও বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এতে শিশুটি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আল-মাওয়াসি এলাকার দিকে নজর রাখা যায়—এমন অবস্থান থেকে ইসরায়েলি সেনারা বাস্তুচ্যুতদের তাঁবু লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি ছুড়ছে। এ সময় নিজের তাঁবুর ভেতরে থাকা এক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। পরে তাকে অস্ত্রোপচারের জন্য নাসের হাসপাতালে নেওয়া হয়।
চিকিৎসাসূত্রের বরাতে আল জাজিরা আরও জানিয়েছে, আজ-জাওয়াইদায় পৃথক আরেকটি ড্রোন হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবারের হামলায় নিহতের সংখ্যা চারজনে পৌঁছেছে। এ ছাড়া দেইর আল-বালাহর আল-বারাকা এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি জমায়েতে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন আহত হন, তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
গাজা সিটির উত্তর-পশ্চিমে আল-কারামা এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে ড্রোন হামলায় এক ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে আল-শিফা হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। শহরটির পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েলি কামান থেকে ব্যাপক গোলাবর্ষণের পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় নৌবাহিনীর জাহাজ থেকেও গুলি চালানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মাঘাজি শরণার্থীশিবিরের পূর্ব দিকে হোসনি আল-মুসাদ্দার মসজিদের আশপাশে ইসরায়েলি সামরিক যান থেকে ভারী গুলিবর্ষণ করা হয়। কাছাকাছি অবস্থানরত একটি ড্রোন থেকেও বোমা ফেলা হয়েছে। তবে এসব ঘটনায় হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে খান ইউনিসের পূর্বাঞ্চলে পরপর দুটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার মধ্যে থাকা বাড়িঘর ও বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে বলে জানা গেছে। সাংবাদিক আশরাফ আমরার ভাষ্য, আল-মুসাদ্দার ও দেইর আল-বালাহর পূর্ব সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনী সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ সময় বসতবাড়ি ও কৃষিজমি ধ্বংস করে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর পেছনে আরও ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে তারা।
এর আগে গত বুধবার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় তিন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২১ জন আহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের একজন আগের হামলায় পাওয়া আঘাতের কারণে মারা যান।
মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ৬০২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৭৯৪ জন। আর ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত মোট নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ৬১৮ এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৯২০ জন।
এদিকে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস গত সোমবার জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ইসরায়েল মোট ৫ হাজার ৯৮৯ বার তা লঙ্ঘন করেছে। শুধু অক্টোবর মাসেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ৭৫৩টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ৩৪৬টি গোলাবর্ষণ, ৩১০টি বোমা হামলা এবং ৬৪টি বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনা রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা