নারায়ণগঞ্জের পাইস্কা এলাকায় গত ১৮ অক্টোবর রাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে রিপন মিয়াকে ধাওয়া করে একদল ব্যক্তি। একপর্যায়ে তাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রিপন মিয়া স্থানীয় যুবদলের নেতা ছিলেন। স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের ভাষ্য, একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকায় কার নাম থাকবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ সম্প্রতি তীব্র হয়ে উঠেছিল। সেই বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
রিপনের মেয়ে শিলা বলেন, ‘কয়েকজন লোক আমার বাবাকে ধাওয়া করে কুপিয়েছে।’
স্থানীয় বিএনপির সভাপতি এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের বিরোধকে দায়ী করেছেন।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর (জামায়াত) সমর্থকদের সংঘর্ষেও প্রাণ হারান দুই ভাই। পুলিশ জানায়, রমজানে ইফতারের পর কথা-কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। কয়েক ঘণ্টা পর মারা যান হাফিজুর রহমান। তার ভাই ও স্থানীয় জামায়াত নেতা মফিজুর রহমান ১০ মার্চ ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এ ঘটনার জন্য বিএনপি ও জামায়াত একে অপরকে দায়ী করে। পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করার পর তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপির একজন নেতা এবং দলটির স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনের সাবেক এক নেতাও রয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক সহিংসতা
সাম্প্রতিক এসব হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাসেরই অংশ। দেশটির মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নথি, গবেষণা এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দুই দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক সংঘাতের ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। এতে দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের মধ্যে, একই দলের অভ্যন্তরে এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ বিভিন্ন সরকারের আমলেই ঘটেছে।
আসকের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৬৭টি ঘটনায় ৯৪ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৫৮৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ১১২টি। এসব সংঘর্ষে ১৮ জন নিহত এবং ১ হাজার ২১৫ জন আহত হয়েছেন।
এই পরিসংখ্যানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের পাশাপাশি নির্বাচিত সরকারের আমলের ঘটনাও রয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। তার শাসনামলকে কর্তৃত্ববাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরপর প্রধানত রাজনীতির বাইরের ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। পরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসে।
তবে সরকারের এই পালাবদলের মধ্যেও একটি বিষয় অপরিবর্তিত রয়েছে—স্থানীয় পর্যায়ে কার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে সংঘর্ষে মানুষের প্রাণহানি। রাজনৈতিক সহিংসতার এ সমস্যা কোনো একটি সরকারের আমলের নয়; একাধিক সরকার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও তা অব্যাহত রয়েছে।
২০০২ সাল থেকে পাওয়া তথ্যেও একই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। দলের পদ, ব্যবসা, জমি কিংবা সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকাও স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
শুধু বিএনপি-আওয়ামী লীগের বিরোধ নয়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একে শুধু বিএনপি ও আওয়ামী লীগের (আ.লীগ) পারস্পরিক বিরোধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ের আসকের পরিসংখ্যানে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ২৮৪টি। এসব ঘটনায় নিহত হন ৫৫ জন। একই সময়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৩৭ জন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের ২০১৪ সালের ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় আসকের এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শরিক ছিল ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী। ওই সরকারের মন্ত্রিসভায় দলটির দুজন সদস্যও ছিলেন। তবে রাজনৈতিক জোটে থাকা সত্ত্বেও বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ থামেনি।
রওনক জাহানের গবেষণায় উল্লেখ করা আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ১৩৪টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হন আটজন। একই সময়ে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে ৪২টি সংঘর্ষে সাতজন নিহত হন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সংঘর্ষ কমলেও বন্ধ হয়নি দমন-পীড়ন
২০০৭ ও ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ওই দুই বছরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল আটটি, এতে নিহত হন দুজন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল একটি; এতে কেউ মারা যাননি।
প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষও কমে ৩২টিতে নেমে আসে। এসব ঘটনায় নিহত হন সাতজন। সব কটি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার সংঘর্ষে। তুলনামূলকভাবে, ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শুধু আওয়ামী লীগ-বিএনপির সংঘর্ষেই ১১৮ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট প্রাণহানি ছিল নয়জন।
তবে রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষ কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, ওই সময়ে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ছিল না। জরুরি অবস্থার মধ্যে পরিচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করেছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এ সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও বিধিনিষেধ ছিল। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ ও সংঘর্ষের সুযোগ এবং পরিবেশ—দুটিই বদলে গিয়েছিল।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর দলীয় সংঘর্ষ বৃদ্ধি
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠনের পর দলটির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ বেড়ে যায়। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ৭৯৯টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হন ৯৭ জন। একই সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ২২৯টি, যাতে ২১ জন নিহত হন।
তবে এসব পরিসংখ্যানে দুই দলের জন্য সমান সময়সীমা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি তুলে ধরাই এখানে মূল বিষয়; কোনো সরকারকে অন্য সরকারের সঙ্গে তুলনা করে অবস্থান নির্ধারণ করা নয়।
স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিয়মিত সহিংসতার কারণ হলেও জাতীয় রাজনৈতিক সংঘাতের সময় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি বেড়েছে।
২০১৩ সালে বিতর্কিত নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হয়ে উঠলে আসকের হিসাবে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫০৭ জন নিহত হন। সংস্থাটির বার্ষিক তালিকায় হরতালকেন্দ্রিক সহিংসতায় ১৮৫ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ২৬ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরও ৮৫ জন নিহত হন।
ওই বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। আসকের মূল বার্ষিক নথিতে জামায়াত, দলটির ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির এবং পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে ৩৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষের পৃথক হিসাবে আরও ১১ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জামায়াত বা ছাত্রশিবিরের নাম থাকা অন্য শ্রেণিগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ-জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষে ১৩ জন, আওয়ামী লীগ-জামায়াতের সংঘর্ষে ৯ জন, শিবির-পুলিশের সংঘর্ষে ৯ জন এবং আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত-পুলিশের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ছোট শ্রেণিতেও প্রাণহানির তথ্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০১৩ সালে জামায়াত বা ছাত্রশিবিরের সংশ্লিষ্টতা উল্লেখ করা বিভিন্ন সংঘর্ষের শ্রেণিতে ৫০৭ জন নিহতের মধ্যে ৯৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। তবে এসব শ্রেণি সংঘর্ষে অংশ নেওয়া পক্ষগুলোর পরিচয় তুলে ধরে; কারা এসব মৃত্যুর জন্য দায়ী, তা নির্ধারণ করে না।
পরবর্তী বছরগুলোতে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নাম উল্লেখ করা সংঘর্ষের সংখ্যা কমে আসে। ২০১৫ সালে দল দুটির যেকোনো একটির নাম থাকা নয়টি ঘটনায় তিনজন নিহত হন। ২০১৬ সালে এমন দুটি সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালের তালিকায় শিবির-পুলিশের একটি সংঘর্ষের উল্লেখ রয়েছে, যাতে তিনজন আহত হন। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের তালিকায় জামায়াত বা ছাত্রশিবিরের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ওই বছরগুলোতে এসব দলের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে বার্ষিক সারসংক্ষেপ থেকে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষেও প্রাণহানি
জাতীয় পর্যায়ে বড় রাজনৈতিক সংঘাত না থাকলেও রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যকার বিরোধে প্রাণহানি ঘটেছে। ২০১৭ সালে আসকের হিসাবে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫২ জন নিহত হন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষেই মারা যান ২৯ জন। তবে দলটির ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষের পৃথক শ্রেণির প্রাণহানি এই সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনও রাজনৈতিক সহিংসতার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পাঁচ বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৬ সালে এসব নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় ১৪৭ জন নিহত হন। ওই বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট ১৭৭ জনের মৃত্যুর অধিকাংশই ছিল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে।
২০২১ সালেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘর্ষে ১১৩ জন নিহত হন। ওই বছর সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট প্রাণহানি ছিল ১৫৭ জন।
এসব পরিসংখ্যান থেকে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত ছিল, তা জানা যায় না। তবে সংসদ নির্বাচন ছাড়াও স্থানীয় পর্যায়ের পদ-পদবি ও ক্ষমতা বণ্টনকে কেন্দ্র করে যে ব্যাপক সহিংসতা ঘটে, তা স্পষ্ট হয়।
আধিপত্য ও আর্থিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব
রাজনৈতিক সহিংসতার কারণ নিয়ে গবেষণায়ও স্থানীয় পর্যায়ের আধিপত্যের বিষয়টি উঠে এসেছে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি গবেষণায় ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের সহিংসতার কারণ বিশ্লেষণে দলগুলোর অভ্যন্তরে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইকে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ঠিকাদারি কাজ, সম্পত্তি, জমি ও চাকরি নিয়ে বিরোধও সহিংসতার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসে।
গবেষণাটিতে নিজস্ব তথ্যভান্ডার ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এর পরিসংখ্যান সরাসরি আসকের তথ্যের সঙ্গে যোগ করা যায় না। তবে দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতার ধরন বুঝতে গবেষণাটির পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে নেতৃত্ব ও পদ-পদবি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভোটারদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে এসব সংগঠনের মাধ্যমে স্থানীয় নেতারা সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছাতে পারেন। এই যোগাযোগ ব্যবহার করে আয় নিশ্চিত করা কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হলে দলীয় অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার গুরুত্ব শুধু পরবর্তী নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
গণ-অভ্যুত্থানের পরও বদলায়নি স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগ শাসনের অবসান ঘটে। গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন ধরনের রাজনীতি গড়ে তোলার প্রত্যাশা তৈরি হয়। আন্দোলনকারী ও রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার কথা বলেন। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পরও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব থামেনি।
বিভিন্ন সরকারের আমলে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা থাকলেও সব সরকার কিংবা সব ধরনের সহিংসতাকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকার পতনের সময়কার সহিংসতা এবং রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ নিয়মিত সংঘর্ষের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক তদন্তে সাবেক সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংস গোষ্ঠীগুলোর পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। বিক্ষোভকারীদের দমনে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহিংসতা ব্যবহারের নীতিও ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে আসকের সাধারণ বার্ষিক তালিকায় ১০০ জন নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। তবে এটি গণ-অভ্যুত্থানে নিহত সবার হিসাব নয়। আন্দোলন চলাকালে মৃত্যুর ঘটনা আসক আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। তাই সাধারণ রাজনৈতিক সহিংসতার তালিকার ১০০ জনের সংখ্যাকে গণ-অভ্যুত্থানে মোট প্রাণহানির হিসাব হিসেবে বিবেচনা করলে দমন-পীড়নের প্রকৃত মাত্রা আড়ালে থেকে যাবে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারালে স্থানীয় পর্যায়ে দলটির নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য ঘিরে নতুন করে প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
চট্টগ্রামে ব্যবসা ও জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ
চট্টগ্রামেও স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতা ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের বিরোধ প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নগরের চান্দগাঁও এলাকায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে নিহত হন জুবায়ের উদ্দিন বাবু। পুলিশের ভাষ্য, একটি কৃত্রিম টার্ফ মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল।
চট্টগ্রামে হত্যা, হামলা, সংঘর্ষ ও জমি দখলের ১৫টি ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করে প্রথম আলো। পত্রিকাটির অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের পর অবৈধ আয়ের বিভিন্ন উৎসের নিয়ন্ত্রণ এক পক্ষের কাছ থেকে অন্য পক্ষের হাতে চলে যায়। এসব বিরোধের সঙ্গে পরিবহন, বাজার, জমি ও রেলওয়ের ঠিকাদারি কাজের সম্পর্ক ছিল। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন নেটওয়ার্ক দখলের অভিযোগ ওঠে বিএনপি নেতা ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
বিএনপি জাতীয় ক্ষমতায় ফেরার আগেই, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসব ঘটনা ঘটছিল।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ রাজনৈতিক প্রাণহানির বড় কারণ হয়ে ওঠে। দলটি সরকার গঠনের আগেই ২০২৫ সালে বিএনপির বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ১৯২টি সংঘর্ষের ঘটনা নথিভুক্ত করে আসক। এসব ঘটনায় নিহত হন ৪০ জন। যুবদলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে মারা যান আরও আটজন। ওই বছর রাজনৈতিক সহিংসতার ৪০১টি ঘটনায় মোট ১০২ জন নিহত হওয়ার তথ্য দেয় সংস্থাটি।
নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিও সংঘর্ষের বাইরে নয়
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতারা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের রাজনীতির বিকল্প গড়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে দলটির যাত্রা শুরু হয়।
তবে রাজনৈতিক সহিংসতার নথিতে নতুন দলটির সংশ্লিষ্টতাও উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে এনসিপিকে ঘিরে নয়টি সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং ১৭১ জন আহত হন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দলটির সংশ্লিষ্টতায় আরও ২৯টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন ২২০ জন। এসব সংঘর্ষের অধিকাংশই বিএনপির সঙ্গে হয়েছিল।
বিএনপি সরকার গঠনের আগেই দলটির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে থাকে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার এবং আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসা-বাণিজ্যের দখল নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিল। এতে কোনো কোনো পরিবারের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ান দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধারাই।
২০২৫ সালের ৮ মার্চ চুয়াডাঙ্গায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন দলটির স্থানীয় পর্যায়ের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম। তার একটি ছোট দোকান ছিল। স্ত্রী নাহিদা খাতুন স্থানীয় একটি ক্লিনিকে কাজ করতেন। স্বামীর হত্যার ঘটনায় তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ৩৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন।
নাহিদা খাতুনের ভাষ্য, রাজনৈতিক মামলার কারণে তার স্বামী বছরের পর বছর বাড়িতে ফিরতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের দলের লোকজনের হাতেই প্রাণ দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সে নিজের দলের লোকজনের হাতেই মারা গেল।’
বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষও বেড়েছে
২০২৫ ও ২০২৬ সালের পরিসংখ্যানে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যকার সংঘর্ষও অব্যাহত থাকার চিত্র পাওয়া যায়। আসকের হিসাবে, ২০২৫ সালে দুই দলের মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষে তিনজন নিহত এবং ৫২০ জন আহত হন।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ ধরনের সংঘর্ষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৭টিতে। এসব ঘটনায় নিহত হন ১০ জন এবং আহত হন ১ হাজার ৫৪ জন। আগের বছরের তুলনায় সময়সীমা কম হলেও সংঘর্ষের সংখ্যা ও প্রাণহানি—দুটিই বেশি ছিল।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরের আসকের তালিকায় ‘দুষ্কৃতকারীদের হামলা ও গুলিবর্ষণ’ শিরোনামের একটি শ্রেণিতে ৫১ জনের মৃত্যুর তথ্যও রয়েছে।
সরকারের দায়িত্বে বিএনপি, জবাবদিহির প্রশ্ন
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরাসরি দলটির সরকারের ওপর বর্তেছে। দলটির নেতারাও সহিংসতা ও দখলদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেছেন।
অক্টোবরে সংসদীয় দলের এক বৈঠকে তারেক রহমান চাঁদাবাজি ও জমি দখলের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে সংসদ সদস্যদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।
পুলিশও রাজনৈতিক পরিচয়কে আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ হিসেবে দেখার দাবি নাকচ করেছে। চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার বলেছেন, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করেই মামলা করা হচ্ছে এবং গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
তবে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এমন কিছু ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে আইনি পদক্ষেপের পরিবর্তে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার কিংবা কমিটি বিলুপ্ত করেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার চক্র
২০০৯ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এম. মনিরুজ্জামানের ‘পার্টি পলিটিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স ইন বাংলাদেশ: ইস্যুজ, ম্যানিফেস্টেশন অ্যান্ড কনসিকোয়েন্সেস’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। সাউথ এশিয়ান সার্ভে সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই গবেষণায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতাকে একটি চক্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, সংঘর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শত্রুতা বাড়ায় এবং সমঝোতার পথ কঠিন করে তোলে। ক্ষমতাসীন সরকার বিরোধীদের দমনে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো ব্যবহার করে, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো এর প্রতিক্রিয়ায় আরও আন্দোলন-সংগ্রামে জড়ায়। এভাবে সহিংসতা একদিকে রাজনৈতিক সংঘাতের ফল হয়ে ওঠে, অন্যদিকে সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করার কারণ হিসেবেও কাজ করে।
গবেষণাটিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথাও বলা হয়েছে। বারবার সহিংসতার ঘটনা ঘটতে থাকলে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে দাবি আদায়ের জন্য শক্তি প্রয়োগ স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং রাজপথে এই সহিংসতার চর্চা ছড়িয়ে দেয়। মনিরুজ্জামানের মতে, এতে গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য প্রয়োজনীয় সহনশীলতা, জবাবদিহি ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার মতো চর্চা দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের আমলে রাজনৈতিক সহিংসতার ধরন বদলেছে। জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সংঘাত ও নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধে সাধারণত প্রাণহানি বেড়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষেও বড় সংখ্যায় মানুষ মারা গেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এসব সংঘর্ষ অব্যাহত থাকার বিষয়টি দেখায়, শুধু জাতীয় নেতৃত্বের পরিবর্তন স্থানীয় পর্যায়ের পদ, ব্যবসা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের সমাধান করতে পারে না।
বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধের ঘটনাও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব এখন দলটির সরকারের। দল থেকে বহিষ্কার এবং পুলিশের গ্রেপ্তারের মতো পদক্ষেপে কিছু ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকায় সহিংসতা মোকাবিলায় সরকারের প্রতিক্রিয়া কতটা বদলেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।