ইতিহাসের গতিপথ সর্বদা সরলরেখায় চলে না; মাঝে মাঝে তা মোড় নেয় রক্তস্নাত অলিগলি অতিক্রম করে রাষ্ট্র ও জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সুনির্দিষ্ট বাঁকে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ভূ-রাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়-পরবর্তী সংকটময় ইতিহাসে তেমনই এক যুগান্তকারী ও অবিনাশী অধ্যায়।
৭ নভেম্বর কেবল একটি নির্দিষ্ট তারিখ নয়; এটি ছিল ইন্দো-পাক উপমহাদেশের আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক নকশা ও চক্রান্তের বিপরীতে বাংলাদেশের তূরীভেদী জাতীয় জাগরণ। সেই কারণে বাংলাদেশের মানুষ ৭ নভেম্বরকে বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, পরবর্তী চার বছরে ভুল শাসননীতি, দুঃশাসন, একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) এবং সার্বিক সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার অশুভ আঁতাতের কারণে তা গভীর সংকটে নিপতিত হয়। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ছিল বাঙালির আজন্ম লালিত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আত্মপরিচয় ও মর্যাদার সঙ্গে বিশ্বের বুকে স্বতন্ত্র পরিচয়ে মাথা উঁচু করে অস্তিত্ব জানান দেওয়ার যে যুগযুগান্তরের স্বপ্ন বাঙালি লালন করেছে, সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ছিল স্বাধীনতার প্রত্যাশা ও চেতনা।
কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তার সে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা ভঙ্গ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। শাসকদল আওয়ামী লীগের দুঃশাসন, লুটপাট, দুর্নীতি, নির্যাতনের স্টিম রোলার মানুষকে বছর পার না হতেই মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করে। শাসক ও সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য। গণতন্ত্র ও জনগণের মৌলিক মানবাধিকার হরণ, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, একদলীয় অগণতান্ত্রিক বাকশালী শাসন, দলীয় পেটুয়া ও রক্ষীবাহিনীর বাহিনীর অত্যাচার, নারকীয় ও বিভৎস হত্যাযজ্ঞ, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, সর্বোপরি মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়া সিপাহী বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও এ দেশের জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী আমজনতা যখন অনুভব করল যে, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও প্রিয় মাতৃভূমি আজ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে চলেছে, ঠিক তখনই সিপাহী-জনতার ঐক্যের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক বিপ্লব ও সংহতি দিবস ছিল মুজিববাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপশক্তির আধিপত্যবাদকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল এবং বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে এনেছিল এ দেশের স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে।
আজ এই ঐতিহাসিক বিপ্লবের ৫১ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আমাদের অত্যন্ত নির্মোহ ও সুগভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন—কীভাবে সেদিন রক্ষিত হয়েছিল এ ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব।
৩ নভেম্বরের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও সেনাবাহিনীতে চরম বিভ্রান্তি
স্বাধীনতার পর একটি আধিপত্যবাদী শক্তি চায়নি বাংলাদেশ শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। তাই সেনাবাহিনীকে দুর্বল রেখে শক্তিশালী প্যারা মিলিটারি ফোর্স রক্ষীবাহিনী গঠন করেছিল। ফলে সেনাবাহিনীর মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র অসন্তোষ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, খাদ্যসংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী তাদের সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বে একটি উচ্চাভিলাষী ও বিভ্রান্তিকর সেনা অভ্যুত্থান ঘটানো হয়। ৩ নভেম্বরের এই অভ্যুত্থানের পেছনের অদৃশ্য চালিকাশক্তি ছিল বিদেশি আধিপত্যবাদী প্রভুদের গোপন নির্দেশ।
দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে জাতীয়তাবাদী ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি বিশেষ পরাশক্তির অশুভ বলয়ে ঠেলে দেওয়ার কুৎসিত নীলনকশা তৈরি করা হয়েছিল। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীরউত্তম ছিলেন একজন সৎ, নীতিবান, পেশাদার ও অত্যন্ত জনপ্রিয় সেনা কর্মকর্তা। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, সেনাবাহিনীতে রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করলে তা দেশের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলবে। তিনি চক্রান্তকারীদের অসাংবিধানিক পদক্ষেপে সায় না দেওয়ায় তাকে নিজ বাসভবনে গৃহবন্দি করা হয়।
সাংবাদিক ও বিখ্যাত গবেষক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার বহুল পঠিত গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ: অ্যা লিগেসি অব ব্লাড’ (১৯৮৬)-এ তৎকালীন পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে লিখেছেন, ৩ নভেম্বরের ক্যু কোনো জনমুখী অভ্যুত্থান ছিল না; এটি ছিল একটি উচ্চাভিলাষী সামরিক পদক্ষেপ, যা সাধারণ সৈনিকদের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। জিয়াউর রহমানের গৃহবন্দিত্ব সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়, কারণ তারা তাকে জাতীয় সম্মান ও সামরিক সততার প্রতীক মনে করত। ৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন স্থানে যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, তা সাধারণ সিপাহী এবং এ দেশের ধর্মপ্রাণ দেশপ্রেমিক জনগণের মধ্যে এই স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয় যে, এ দেশকে আবারও বিদেশি আধিপত্যবাদের কলোনিতে পরিণত করার চক্রান্ত চলছে।
সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও জিয়াউর রহমানের মুক্তি: ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন
৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে, অর্থাৎ ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা সেনানিবাসের সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটে। সিপাহীরা ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার’ এবং ‘সিপাহী-জনতা ভাই ভাই, জিয়াউর রহমানের মুক্তি চাই’ স্লোগানে রাজপথ ও ব্যারাক মুখরিত করে তোলে। অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সাধারণ সিপাহীরা তাদের প্রিয় জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আনে।
মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান যখন সেনানিবাসে বের হয়ে এলেন, হাজারো সাধারণ সৈনিক ও সাধারণ মানুষ তাকে ঘিরে উল্লাসে ফেটে পড়ে। জিয়াউর রহমান কোনো ক্ষমতার লোভ বা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে এগিয়ে আসেননি; বরং সিপাহী ও জনতার আস্থাই তাকে দেশের সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে স্থান করে দেয়। সেনানিবাসের সিপাহীদের বিপ্লবের খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঢাকা শহরে। সাধারণ জনগণ রাজপথে নেমে আসে। সিপাহী ও জনতা কোলাকুলি করে, ট্যাংকের ওপর উঠে জাতীয় পতাকা উড়ায় এবং আধিপত্যবাদ-বিরোধী স্লোগান দেয়। ইতিহাসে সিপাহী ও জনতার এমন রক্তপাতহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত গণবিপ্লবের নজির বিরল।
সেই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ। তার বর্ণনায়, ‘বিপ্লবীর এবং সেপাইরা বিভিন্ন ইউনিট থেকে বেরিয়ে এসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জিয়ার বাসভবনের চারপাশে সমবেত হতে থাকে। সবারই লক্ষ্যস্থল ছিল জিয়ার বাসভবন। সবাই সেখানে একত্র হয়ে দুর্গ ভেঙে বন্দী জিয়াকে বের করে আনবে, এই ছিল পরিকল্পনা।’ (তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা, লে: কর্নেল (অব.) এম.এ. হামিদ, পিএসসি, হাওলাদার প্রকাশনী, ত্রয়োদশ সংস্করণ, ২০২৪, পৃষ্ঠা- ১৫৮)
মুক্তিযুদ্ধকালীন জিয়াউর রহমানের ভূমিকা, উঁচুমানের পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম ও সততার কারণে তিনি সেই অস্থির মুহূর্তে সেনা ও অফিসারদের ভরসার চূড়ান্তস্থলে পরিণত হয়েছিলেন। সেই কারণে তাকে সেনা সদস্যরা মুক্ত করে অস্থির সময় থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন। দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির প্রখ্যাত মার্কিন গবেষক লরেন্স লিফশুলজ তার আলোচিত গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভুল্যুশন’ বইয়ে এই অভূতপূর্ব দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ৭ নভেম্বরের ভোরের আলো ফোঁটার আগেই হাজার হাজার সৈনিক এবং বেসামরিক জনতা ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। ট্যাংকগুলো জনগণকে দমন করতে বের হয়নি, বরং সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ফুল দিয়ে সজ্জিত হয়ে রাজপথে নেমেছিল।
৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহী-জনতা সেই পতাকাকে উঁচিয়ে ধরেছিল, নত হতে দেয়নি। কেননা এই রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে পদানত করার ষড়যন্ত্র ছিল সবার অলক্ষে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ’৭৫-এর সেই অস্থির সময়ে বাংলাদেশ বহুমুখী ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। জিয়াউর রহমানের নাম শুনেই দেশবাসী মুক্তির ভরসা পায়। নেমে আসে রাস্তায়।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ এ ব্যাপারে লিখেছেন, ‘আমজনতা পথের পাশে দাঁড়িয়ে উল্লাস করে, হাততালি দেয় এবং অনেকে জীবনে প্রথমবারের মতো ট্যাংকে বা সেনবাহিনীর ট্রাকে চড়ে ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়ান।’ (ইতিহাসের বাঁকবদল, একাত্তর ও পঁচাত্তর, মহিউদ্দিন আহমদ, পঞ্চম মুদ্রণ, মার্চ-২০২৩, পৃষ্ঠা-১২০)
কেবল আম জনতা নয়, দেশের সর্বপর্যায়ের এলিট শ্রেণিও তখন জিয়াউর রহমান নামের মধ্যেই তাদের ভরসা খুঁজে পান। সাবেক জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসানের বর্ণনায় তার প্রমাণ মেলে, ‘জিয়ার ক্ষমতাগ্রহণকে দেশের জন্য বর্তমান অবস্থার সর্বাপেক্ষা কল্যাণকর বলে সকলেই অভিমত প্রকাশ করলাম।’ (১৯৭৫ সাল, সৈয়দ আলী আহসান, বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, চতুর্থ মুদ্রণ, অক্টোবর, ২০২১, বাংলাবাজার, ঢাকা, পৃষ্ঠা-১৫৯)
আধিপত্যবাদের পরাজয় ও স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিপ্লব কেবল একজন ব্যক্তির মুক্তি ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশকে একটি পুতুল রাষ্ট্র বা ‘স্যাটেলাইট স্টেটে’ পরিণত করার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পরাজয়। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নীতিতে যেভাবে প্রতিবেশী দেশের অনুকম্পা ও আধিপত্য চেপে বসেছিল, ৭ নভেম্বরের বিপ্লব সেই শৃঙ্খলকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের সেই শক্তিকে চূড়ান্তভাবে ভেঙে দেয়, যা জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশকে গ্রাস করার হুমকি দিচ্ছিল।
এটি বাংলাদেশকে কোনো প্রভু অনুগত রাষ্ট্র নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম অনুঘটক হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে। ৭ নভেম্বরের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্পষ্ট বার্তা দেয়, এ দেশের জনগণ কারো দাসত্ব মেনে নেওয়ার জন্য লক্ষ শহীদের রক্তে স্বাধীনতা অর্জন করেনি।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তিনি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এবং বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব, চীন ও পশ্চিমাদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করেন। ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক মর্যাদাপূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান: সামরিক আইন প্রশাসক থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব জিয়াউর রহমানকে এক ঐতিহাসিক জাতীয় দায়িত্বের মুখোমুখি দাঁড় করায়। দেশ যখন চরম অরাজকতা, অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং চরম রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিল, তখন রাষ্ট্র পরিচালনার ভার গ্রহণ করা কোনো বিলাসিতা ছিল না, ছিল এক কঠিন ব্রত।
জিয়াউর রহমান প্রথমে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে জাতীয় সংহতি রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পুনর্বাসনের স্বার্থে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তবে সামরিক পোশাকের আড়ালে তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। জিয়াউর রহমান গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, একটি টেকসই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগণের সরাসরি সম্মতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনরুজ্জীবন অপরিহার্য। তাই তিনি দ্রুত দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান তার গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ পলিটিক্স: প্রবলেমস অ্যান্ড ইস্যু’ (১৯৮৬)-এ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন সম্পর্কে লিখেছেন, জিয়াউর রহমান অনুধাবন করেছিলেন, সামরিক শাসনজনিত বৈধতা ক্ষণস্থায়ী। গণভোট আয়োজন, স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা এবং অবশেষে ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ের জন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে তিনি তার শাসনকে বেসামরিকীকরণ করেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিয়াউর রহমান ব্যাপক জনভোটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি সিপাহী-জনতার বিপ্লবের জনআকাঙ্ক্ষাকে সরাসরি গণতান্ত্রিক বৈধতায় রূপান্তর করেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন ও ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’
৭ নভেম্বরের বিপ্লবের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম হয়, তার মূর্ত রূপ হলো ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি)। বিএনপি কেবল একটি রাজনৈতিক দল ছিল না; এটি ছিল ৭ নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লবের চেতনাসম্ভূত এক বিরাট জাতীয় ঐক্যমঞ্চ। এ দেশের বামপন্থী, ডানপন্থী, মধ্যপন্থী ও ঐতিহ্যবাহী দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তিকে একই পতাকাতলে নিয়ে আসার এক ঐতিহাসিক প্রয়াস ছিল এটি।
শহীদ জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির অনন্য মিশ্রণে গঠিত এ ভূখণ্ডের মানুষের আসল পরিচয় হলো ‘বাংলাদেশি’। আওয়ামী লীগের সংকীর্ণ ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ যা এ দেশের অন্যান্য নৃগোষ্ঠীকে বাদ দিয়েছিল এবং বাংলাদেশকে একটি বিশেষ প্রতিবেশীর সাংস্কৃতিক বলয়ে আটকে রাখতে চেয়েছিল, তার বিপরীতে জিয়ার ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ এ দেশের সর্বস্তরের মানুষকে একটি শক্তিশালী জাতীয় পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করে এবং জাতীয় ঐক্যের সূচনা করে।
তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে খ্যাতিমান সমাজবিজ্ঞানী ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে তার এক নিবন্ধে লিখেছেন, জিয়াউর রহমান কর্তৃক উদ্ভাবিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ জাতিকে ভৌগোলিক সীমানা, সার্বভৌম গৌরব এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে প্রতিষ্ঠিত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয় এনে দেয়, যা বিদেশি সাংস্কৃতিক আধিপত্য ছিন্ন করে সবার ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। বিএনপির ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল এ দেশের অর্থনীতির প্রতিটি খাতকে স্বনির্ভর করার এক অমূল্য দলিল। এ কর্মসূচির মাধ্যমেই কৃষিতে বিপ্লব, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, তৈরি পোশাক শিল্প খাতের সূচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির মতো মহতী উদ্যোগগুলো গৃহীত হয়েছিল, যা আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
স্বনির্ভর বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদাশীল অবস্থান
৭ নভেম্বরের বিপ্লবের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশের শাসনভার লাভ করেছিলেন, সেই বাংলাদেশ ছিল ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নামে আখ্যায়িত এক অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া রাষ্ট্র। কিন্তু তার কঠোর পরিশ্রম, সততা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হতে শুরু করে।
জিয়াউর রহমান অনুধাবন করেছিলেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘Sovereignty is not given; it is constantly constructed through economic and political self-reliance.’ (সার্বভৌমত্ব কোনো দান নয়; এটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত গঠন করতে হয়।) ঠিক এর কাছাকাছি একটি কথা বলেছিলেন আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক। তিনি বলেছিলেন, ‘Sovereignty is not given, it is taken.’
জিয়াউর রহমান ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন। তিনি খাল খনন করে তার মাধ্যমে আনীত পানি দিয়ে কৃষি বিপ্লব ঘটান, গ্রামে গ্রামে গিয়ে ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ পরিচালনা করেন এবং এ দেশের কৃষককে উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করেন। তার আমলেই বাংলাদেশ খাদ্য ঘাটতি পূরণ করে বিদেশে চাল রপ্তানির যোগ্যতা অর্জন করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে তিনি শীর্ষে নিয়ে যান। ইসলামী সম্মেলন সংস্থায় (ওআইসি) জিয়াউর রহমান ওআইসি আল-কুদস কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার যে স্বপ্ন জিয়াউর রহমান দেখেছিলেন, তার ফলশ্রুতিতেই পরবর্তীতে গঠন করা হয় সার্ক। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাপানকে পরাজিত করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়, যা ছিল জিয়ার দূরদর্শী কূটনৈতিক সাফল্যের এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
বিএনপির রাজনৈতিক ধারা ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা
৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মূল চেতনা ছিল—বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা, আধিপত্যবাদকে প্রতিহত করা এবং গণমানুষের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। শহীদ জিয়াউর রহমানের বিএনপি এই চেতনাকেই তাদের মূল রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছে। আজকের প্রেক্ষাপটে, যখনই বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়, যখনই কোনো অগণতান্ত্রিক ও আধিপত্যবাদী শক্তি জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে দেশকে একটি পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়, তখনই ৭ নভেম্বরের বিপ্লব আমাদের প্রেরণা জোগায়।
বিএনপির অদম্য যাত্রা প্রমাণ করেছে, এ দেশের মাটিতে আধিপত্যবাদের কোনো স্থায়ী স্থান নেই। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব এবং আমাদের জননেতা তারেক রহমানের দূরদর্শী নির্দেশনায় বিএনপি সর্বদা দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল তিনি বাংলাদেশিদের একটি জাতীয় গর্ব ও পরিচয়ের অনুভূতি দিয়েছিলেন। তিনি একটি হতাশ জাতিকে আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন।
৫১ বছর পূর্তিতে ৭ নভেম্বরের অঙ্গীকার
আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের ৫১ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আমাদের শপথ নিতে হবে, ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহী ও জনতা যে ঐক্যের বিনিময়ে এবং যে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্যের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছিল, আমরা তা কোনো অবস্থাতেই ক্ষুণ্ন হতে দেবো না।
৭ নভেম্বর আমাদের শেখায়, জনগণের ঐক্য ও সেনাবাহিনীর দেশপ্রেম যদি এক সুতোয় গাঁথা হয়, তবে পৃথিবীর কোনো আধিপত্যবাদী শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে গোলাম বানিয়ে রাখতে পারে না। শহীদ জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক বাণী আজও আমাদের হৃদয়ে অনুরণিত হয়, ‘দেশ ও জাতির স্বার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, স্বনির্ভর হতে হবে।’
৭ নভেম্বরের চেতনাই হচ্ছে বাংলাদেশের অস্তিত্বের গ্যারান্টি। আজকে যখন দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে বাংলাদেশকে অস্থির করতে, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা নানামুখী চক্রান্তে লিপ্ত, তখন ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করা, ধারণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের এই মহান বার্তা প্রতিটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কর্ম ও অবদান অমর হোক, সিপাহী বিপ্লবের চেতনা চিরজীবী হোক, আর আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ চিরকাল স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকুক। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
লেখক: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার; সংসদ সদস্য, কক্সবাজার-১; এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি।