সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে মহাসড়কগুলোকে চার লেন বিশিষ্ট করা হোক

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। সরকার সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে খুবই আন্তরিক। কিন্তু এটা নিশ্চিত, সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো খুঁজে বের করতে না পারলে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে না, বরং দিন দিন বাড়তেই থাকবে। গত ঈদের পর কর্মস্থলে ফেরার পথে ছোট-বড় অনেক দুর্ঘটনায় অল্প কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য মানুষ সড়কে প্রাণ হারিয়েছে।

‘পরিবারে রইল শুধু ছোট্ট রিফাত’ শিরোনামে গত ১৯ আগস্ট প্রকাশিত সহযোগী দৈনিকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মা ও স্ত্রী এবং চার সন্তানকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরছিলেন হোটেল ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন। সঙ্গে ছিলেন হোটেলের এক কর্মচারীও। আটজন মিলে চেপেছিলেন অটোরিকশায়। পথে বেপরোয়া এক বাসের ধাক্কায় নিহত হন অটোচালকসহ গাড়ির নয়জন আরোহীর আটজনই। শুধু বেঁচে গেছে গাড়ির সবচেয়ে ছোট্ট আরোহী রিফাত হোসেন (৮), সে জসিম উদ্দিনের ছোট ছেলে।...’

২১ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘মহাসড়ক যেন মৃত্যু ফাঁদ’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সূত্রে বলা হয়, ‘চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। চালকের দক্ষতার অভাব, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, ট্রাফিক আইন না মানা, ভাঙাচোরা রাস্তা, চালকের গতিসীমা না মানা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা, যেখানে-সেখানে রাস্তা পার হওয়া, ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করা, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং রোড ডিভাইডারের অভাবও দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী।’

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট যে কারণগুলোকে দায়ী বলছে, সেগুলো অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, কোন ধরনের সড়ক দুর্ঘটনায় তুলনামূলক বেশি মানুষ প্রাণ হারায়, তাহলে শেষ কারণটিকে (রোড ডিভাইডারের অভাব) সবার আগে রাখতে হবে। কারণ রোড ডিভাইডারের অভাবে যে দুর্ঘটনাগুলো ঘটে, সেগুলো হয় সবচেয়ে ভয়াবহ ও মারাত্মক। রোড ডিভাইডারের অভাবে একই লেনে দুই মুখি গাড়ি চলতে গিয়ে কোনো একটা গাড়ির সামান্য ভুলের কারণে উভয় গাড়ি মুখোমুখি সংঘর্ষের শিকার হয় এবং এ ধরনের সংঘর্ষে অধিকাংশ সময় উভয় গাড়ির একাধিক বা অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারায়। শুধু এই ঈদের পর সারা দেশে এ পর্যন্ত যে সড়ক দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেই ঘটনার সংবাদগুলো সামনে রাখলে খুব সহজেই এই সত্যটা পরিষ্কার হবে, মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণেই সবচেয়ে বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে।

বাংলাদেশের যেসব শহরের মধ্যকার সড়কগুলো ডিভাইডারযুক্ত তথা চার লেনবিশিষ্ট, সেসব শহরে মুখোমুখি সংঘর্ষের কোনো ঘটনা ঘটে না। বর্তমান সরকার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে চার লেনে রূপান্তর করেছে। আগে মুখোমুখি সংঘর্ষের অসংখ্য মর্মান্তিক ঘটনায় গত কয়েক দশকে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু এখন কি এই মহাসড়কে যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষের কোনো ঘটনা ঘটে? শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নয়, দেশের আরো অনেকগুলো মহাসড়ক ইতিমধ্যে চার লেন বিশিষ্ট করা হয়েছে এবং অনেকগুলোর কাজ চলছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ঘটছে খুব দ্রুত। যেভাবে উন্নয়ন হচ্ছে, এমন দিন হয়তো খুবই নিকটে, যখন দেখা যাবে, দেশে চার লেন বিহীন কোনো মহাসড়ক আর নেই। যত দ্রুত দেশের মহাসড়কগুলোকে চার লেন বিশিষ্ট করা হবে, তত দ্রুত সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু সংখ্যা হ্রাস পাবে। সড়কে অন্যভাবে যে দুর্ঘটনাগুলো ঘটে, সেগুলো হ্রাস করাটা কঠিন হলেও অন্তত যে দুর্ঘটনায় তুলনামূলক বেশি মানুষ নিহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেই দুর্ঘটনা হ্রাস করা সহজ ও সম্ভব।

লক্ষ্মীপুর