হাজিরা দিয়ে চলে গেছেন আরএমও, রোগী দেখেন কমিউনিটি চিকিত্সক

সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সকদের কর্মসময় সকাল ৮টা থেকে বেলা আড়াইটা। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে নির্ধারিত সময়ে অনেক চিকিত্সকের অনুপস্থিতি এবং হাসপাতালের আবাসিক ভবনে না থেকে শহরে বসবাস করে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত থাকার অভিযোগ নতুন কিছু নয়।

সরকার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য ডিজিটাল হাজিরা পদ্ধতি চালু করেছে, কিন্তু এতেও  চিকিত্সকদের যথাসময়ে কর্মস্থলে উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অনেকে বিলম্বে কিংবা ইচ্ছামাফিক কর্মস্থলে যাওয়া-আসা করে হাজিরা দিয়ে কর্মস্থল থেকে বের হয়ে নিজ কাজে কিংবা প্রাইভেট প্র্যাকটিসে চলে যান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথাগুলো বলেন     জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একাধিক কর্মচারী ও স্থানীয় এলাকার লোকজন।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে ঐ হাসপাতালে গিয়ে এমনই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) সকাল ৯টা ৩৫ মিনিট ৮ সেকেন্ডে ডিজিটাল হাজিরা দিয়ে ব্যক্তিগত কাজে চলে গেছেন নোয়াখালীতে। তখনো চিকিত্সকদের কেউ হাসপাতালে আসেননি। এ সময় জরুরি বিভাগে রোগী দেখছিলেন ঐ উপজেলার সাহেবাবাদ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার আরিফুল ইসলাম। এসব বিষয়ে কুমিল্লার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাহাদাত হোসাইন বলেন, ডিজিটাল হাজিরা দিয়ে কর্মস্থল থেকে চলে যাওয়া দায়িত্বহীনতার পরিচয় এবং এটি বিবেক বর্জিত কাজ।          

শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এ উপজেলার আটটি ইউনিয়নের জনসংখ্যা প্রায় তিন লাখ। এখানকার জনগণের স্বাস্থ্যসেবার ভরসা এই সরকারি হাসপাতালটি। নিত্যদিনের স্বাস্থ্যসেবার চিত্র সরেজমিন দেখতে বৃহস্পতিবার সকালে ঐ হাসপাতালে যাওয়া। তখন ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৯টা। দুই তলাবিশিষ্ট ৫০ শয্যার ঐ হাসপাতালের নিচতলায় জরুরি বিভাগে রোগী দেখছেন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার আরিফুল ইসলাম। তিনি উপজেলার সাহেবাবাদ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে কর্মরত বলে জানালেন। তিনি বললেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ মামুন খান হজে আছেন। আরএমও ডা. কামরুল হাসান ছুটিতে। জরুরি বিভাগের চিকিত্সক ডা. শাহিদা আক্তারের পরিবর্তে আমি রোগী দেখছি।’ পার্শ্বের দুইতলা ভবনে ডাক্তারদের ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর কক্ষগুলোর দরজা খোলা। এসব কক্ষে ফ্যান ঘুরছে, আর বৈদ্যুতিক লাইটের আলোও জ্বলছে।

কথা হয় অফিস সহকারী সানি আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ‘স্যারেরা (চিকিত্সক) এখনো আসেননি। তাঁরা ১০টা থেকে ১১টার দিকে আসবেন।’ ভবনের ১১ নম্বর কক্ষে কথা হয় রোগীদের টিকিট প্রদানকারী ভারপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘চিকিত্সক আসলেই কেবলমাত্র আমি টিকিট দিয়ে থাকি’। এদিকে সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে সাড়ে ৯টার দিকে তড়িঘড়ি করে ভবনের ৭ নম্বর কক্ষের দরজা খুলছিলেন মিডওয়াইফ অঙ্কিতা তালুকদার পুজা। তার নিকট ঐ কক্ষের চিকিত্সকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ম্যাডাম (ডা. তাছলিমা বেগম) সপ্তাহে রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার হাসপাতালে আসেন। আজ (বৃহস্পতিবার) তিনি ১০টা-১১টার দিকে আসবেন। পরে তিনি (ডা. তাছলিমা বেগম) ১০টা ৫৯ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে হাসপাতালে এসে ডিজিটাল হাজিরা দেন।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কথা হয়, হাসপাতালের মা ও শিশু ওয়ার্ডের ৬৪ নম্বর কক্ষের রোগী তানহার (২৩ মাস) বাবা ঐ উপজেলার বাগরা গ্রামের কামরুল হোসেন, রোগী নুসরাত জাহানের (২ মাস) মা রামনগর গ্রামের শিরীন আক্তারের সঙ্গে। তারা জানান, আগের দিন ডাক্তার রোগীদের দেখে গেছেন, আজ এ পর্যন্ত কোনো ডাক্তার আসেননি। ২য় তলায় নার্সদের ৪৮ নম্বর কক্ষে দায়িত্বরত নার্স শাহিনুর আক্তার জানালেন, ‘স্যারেরা (ডাক্তার) বেলা ১১টায় রাউন্ড দিবেন, তখন সকল রোগী দেখা হবে।’ এসময় তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায় মেডিক্যাল অফিসার ও ইপিআই এর ৫ ও ৮ নম্বর কক্ষ। এরই মধ্যে কুমিল্লা শহরের বাসা থেকে সকাল ৯টা ৫০ মিনিট ৪২ সেকেন্ডে হাসপাতালে উপস্থিত হন জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. হাসিনা সুলতানা, ১০টা ১৮ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে উপস্থিত হন ডেন্টাল সার্জন ডা. খুরশিদা রহমান। তারা কুমিল্লা শহরে বসবাস করেন এবং শহর থেকে আসা-যাওয়া করে অফিস করেন বলে জানান।

আরএমও ডা. কামরুল হাসান অনুপস্থিত। তাই হাসপাতালের বিষয়ে তথ্য জানার জন্য প্রধান সহকারী কবির আহম্মেদের কক্ষে দীর্ঘক্ষণ বসে থেকেও তাকে পাওয়া যায়নি। 

কুমিল্লা নগরীর ঝাউতলা এলাকার শহীদ সামছুল হক সড়কের পার্শ্বে ঐ হাসপাতালের (ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে) গাইনী বিশেষজ্ঞ ডা. তাছলিমা বেগমের একটি হসপিটাল রয়েছে। এর নাম ‘তাছলিমা মেটার্নিটি অ্যান্ড ফার্টিলিটি কেয়ার সেন্টার’। নিজস্ব ঐ হসপিটালে তিনি প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখেন। কিন্তু প্রাইভেট চেম্বারে রোগীদের জন্য তিনি যে চিকিত্সাপত্র/প্যাড ব্যবহার করেন এতে তার কর্মস্থল ‘কনসালটেন্ট, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল’ উল্লেখ রয়েছে- যা গর্হিত কাজ বলে মনে করেন রোগীদের অনেকে।

এদিকে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ঐ হাসপাতালের চিকিত্সকদের ডিজিটাল হাজিরা অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসপাতালের ডা. কামরুল হাসান (আরএমও) ৯টা ৩৫ মিনিট ৮ সেকেন্ড, ডা. মো. এনামুল হক ৯টা ৫০ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড, ডা. শাহিদা আক্তার ১০টা ৩৯ মিনিট ২৩ সেকেন্ড, ডা. মোহাম্মদ সোহেল রানা ১১টা ৩২ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে হাজিরা দিয়েছেন এবং ডা. জুনায়েদুর রহমান ছুটিতে আছেন।

ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাহাদাত হোসাইন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ হাসপাতালে ১১ জন ডাক্তারের মধ্যে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মামুন খানসহ দুই জন ছুটিতে আছেন। ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরএমও ডা. কামরুল হাসান ছুটি নেননি। মোবাইল ফোনে জেনেছি সকালে হাজিরা দিয়ে তিনি (ডা. কামরুল হাসান) নোয়াখালী চলে গেছেন। এতে তিনি চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ হাসপাতালের চিকিত্সকদের অনেককে এর আগেও সতর্ক করা হয়েছে। ডিজিটাল হাজিরা দিয়ে কর্মস্থল থেকে চলে যাওয়া দায়িত্বহীনতার পরিচয় এবং এটি বিবেকবর্জিত কাজ। এক্ষেত্রে যারা বিলম্বে কর্মস্থলে হাজিরা দিয়েছেন তাদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে।’