ফাঁসির আদেশ সই করতেন জিয়া পড়ে শোনাত ট্রাইব্যুনাল

ক্ষমতা দখলে রাখতে নির্বিচারে সেনাবাহিনীতে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। সে সময় লোক দেখানো ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য ফাঁসির আদেশে সই করতেন জিয়া। তার পাঠানো ফাঁসির আদেশ পড়ে শোনানো ছিল ট্রাইব্যুনালের কাজ। গতকাল শনিবার সকালে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) আয়োজিত ‘ইতিহাসের অবরুদ্ধ অধ্যায়: ১৯৭৫-৯৬’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সিআরআইয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা ও পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বলা হয়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অবরুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। সাবেক প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতা বজায় রাখতে এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে স্থান করে দিতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালায়। সে সময় ১১ হাজার ৪৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। আরো সাড়ে ৪ হাজার সেনাসদস্যের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। একই নামের দুই জনের এক জন যাবজ্জীবন ও ওপর জনের ফাঁসির আদেশ দেয়া হলেও দ্রুত কার্যকর করার জন্য দুই জনকেই ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে।

সাংবাদিক জাহিদুল হাসান পিন্টু বলেন, আমার গবেষণায় পাওয়া তথ্যে কুমিল্লার এক জল্লাদ একাই ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন ৯২ জনকে। এই ফাঁসি কার্যকরের জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় তাদের সাক্ষাত্কার নিয়ে জেনেছি, ফাঁসির রায়ে আগেই জিয়ার সই দেওয়া থাকত। তারা শুধু জিয়ার দেওয়া রায় পড়ে শোনাতেন।

শহিদ বুদ্ধিজীবীর সন্তান নুজহাত চৌধুরী বলেন, জিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করে আমার বাবাকে হত্যা করা আত্মস্বীকৃত খুনি দৈনিক ইনকিলাবের মাওলানা এম এ মান্নানকে প্রতিমন্ত্রী করেন। আর এইচএম এরশাদ তাকে পূর্ণমন্ত্রী করেন। এ সময় তিনি প্রশ্ন করেন, কেন মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে যুদ্ধাপরাধীদের পুনঃস্থাপন করেছিলেন জিয়া? কেন যুদ্ধ চলাকালে তাকে সেক্টর কমান্ডার পদ থেকে বহিষ্কার করেছিলেন জেনারেল ওসমানি? সে কি আইএসআই’র এজেন্ট হিসেবে বাংলাদেশকে আবারো পাকিস্তান বানানোর এজেন্ডা হাতে নিয়েছিল? আমার মনে হয় এ প্রশ্নগুলো করার সময় এসেছে।

বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস চর্চার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে ব্লগার ও কলামিস্ট মারুফ রসুল বলেন, সরকারের এ বিষয়ে পৃথক একটি অধিদপ্তর খোলা প্রয়োজন। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে চলা প্রোপাগান্ডা মোকাবিলায় সরকারের প্রতিটি দপ্তরকে আরো সক্রিয় হতে হবে।

প্রোপাগান্ডা মোকাবিলায় গণমাধ্যমের ভূমিকা আরো বাড়াতে হবে মন্তব্য করে ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান বলেন, বিদেশে যে কোনো গণমাধ্যমের প্রতিটি বিভাগভিত্তিক ফেসবুক ভেরিফাইড পেইজ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমের তা নেই। তিনি একটি বেসরকারি টিভির নাম বলে জানান, তাদের নামে ২০টির বেশি ফেসবুক পেজ রয়েছে, যেগুলো থেকে মাঝে মধ্যে ভুল তথ্যও প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু এ সবগুলো পেজ ঐ প্রতিষ্ঠানের নয়। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার জন্য ফান্ড প্রদান করা উচিত বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এখনো উইকিপিডিয়াতে বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বেশ কিছু ভুল তথ্য দেওয়া আছে, যা রেফারেন্সের অভাবে ঠিক করা যাচ্ছে না। আর সে জন্য আমাদের প্রচুর গবেষণা ও প্রতিবেদন প্রয়োজন। এ সময় আলোচকরা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের চেতনাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই চেষ্টা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিগুলো। আর সে কারণেই এখনো ওই অশুভ শক্তি মুক্তচিন্তার মানুষদের হত্যা করে যাচ্ছে। তরুণদের উপস্থিতিতে হওয়া এই আলোচনা সভার উপস্থাপনা করেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদ।