আমনের বাম্পার ফলন

ন্যায্য দাম না পেয়ে হতাশ কৃষক

মাঠজুড়ে সোনালী ধান আর দক্ষিণা বাতাসে দোলানো শীষ। ফসলের এমন মাঠ দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। বেড়েছে তাদের ব্যস্ততা। তবে বাজারদর মন্দা হওয়ায় তাদের এই হাসি ম্লান হয়েছে। বাজারে ধানের যে দাম তাতে শ্রমমূল্য কিংবা লাভতো দূরের কথা, উত্পাদন খরচই উঠছে না। তাই দুশ্চিন্তায় পড়েছে কৃষক। তবুও বুকভরা আশা নিয়ে মাঠ থেকে ফসল গোলায় তুলতে ব্যস্ত কৃষক-কিষাণিরা। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার বিভিন্ন আমন ধানের ক্ষেত ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ মৌসুমে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৩৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে উফশী ২১ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের ১৪ হাজার হেক্টর। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৪.৫ টন থেকে ৫ টন ধান উত্পাদন হয়েছে। ধানের দাম কম থাকার বিষয়ে কৃষি বিভাগের দাবি, খুব শীঘ্রই সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু হবে। তাহলে ধানের দাম বেড়ে যাবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার রাঙ্গাবালী, ছোটবাইশদিয়া, বড়বাইশদিয়া, চরমোন্তাজ ও চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নে প্রত্যাশার চেয়ে আমনের ভালো ফলন হয়েছে। মাঠভরা পাকা সোনালী ধানের মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা কৃষক পরিবার। উত্সবমুখর পরিবেশে মাঠে চলছে ধান কাটা। আর আঁটি বেঁধে বাড়ির উঠান কিংবা নির্ধারিত জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে মাড়াই করে রোদে শুকানো হয়। পরে গোলায় তোলা। এসব কাজে কৃষকের পাশাপাশি কিষাণিরাও ব্যস্ত সময় পার করছে। তবে বর্তমানে ধানের বাজারদর কম থাকায় তাদের এই শ্রম বৃথা হয়ে যাবে নাতো, এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কৃষক পরিবারের মুখে।

কথা হয় উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের উত্তর চতলাখালী গ্রামের কৃষক বাদলের সঙ্গে। সে ৪-৫জন কৃষকের সঙ্গে ধান কাটতে ব্যস্ত ছিল। কাজের ফাঁকে বলেন, ‘এ বছর আমন ধান ভালো হইছে। কিন্তু বাজারে দাম নেই। শেষ পর্যন্ত যদি দাম না উঠে (বাড়ে) তাহলে লোকসানতো হবেই, কষ্টও যাবে বৃথা।’ রেজাউলের পাশের ক্ষেতে নিজের জমির ধান কাটায় ব্যস্ত কৃষক আদম বলেন, ‘এক মণ ধান উত্পাদনের বীজ, কীটনাশক, ওষুধসহ যাবতীয় খরচ থেকে শুরু করে বাজারজাত করতে ৬০০-১০০০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু বর্তমানে এক মণ ধানের বাজারদর ৫৫০-৫৮০ টাকা। তাহলে ধান লাগাইয়া লাভ কি? যা খরচ হয়, তাইতো ওঠে না।’

রাঙ্গাবালী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের কৃষক নাজির হাওলাদার বলেন, ‘নিজের সঞ্চয় ও ঋণ করে আড়াই কানি জমিতে আমন দিছি। কিন্তু বাজারে ধানের দাম  নেই। ৬০০ টাকা রোজে চারজন দিনমজুর ধান কাটে। দিনমজুরের টাকা আর ঋণের কিস্তি দিতে এখন কম দামেই ধান বিক্রি করতে হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বে) মো.আব্দুল মন্নান বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং কৃষি বিভাগের তত্পরতা থাকায় এ মৌসুমে আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। ধানের দাম কম থাকায় আমরাও চিন্তিত। তবে দুই-এক সপ্তাহের মধ্যেই ধানের দাম বেড়ে যাবে। খুব শীঘ্রই সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু হয়ে যাবে।’

বাম্পার ফলনেও হাসি নেই কৃষকের!

আগৈলঝাড়া (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, আগৈলঝাড়ায় আমনের বাম্পার ফলনের পরেও বাজারে দাম না থাকায় হাসি নেই কৃষকের মুখে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তা।

আগৈলঝাড়া উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র মণ্ডল জানান, চলতি আমন মৌসুমে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৭৭০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে চাষাবাদ শুরু হয়েছিল। এরমধ্যে ১৭৫ হেক্টর উফশী আমন ও ৫২৫ হেক্টর স্থানীয় উফসী জাতের আমন ধান। তবে লক্ষ্যমাত্রার বেশি আমন আবাদ হয়েছে উপজেলায়। তিনি আরও বলেন, রোপা আমন ক্ষেতে এবছর ইঁদুরের আক্রমণ বেশি হয়েছে। তারপরেও চাষিরা আশাতীত ভাল ফলন পেয়েছে। 

উপজেলায় বসুন্ডা গ্রামের চাষি কমলেশ হালদার জানান, গত বছরের চেয়ে এ বছর আমনের ফলন দ্বিগুণ হয়েছে। আগে প্রতি ৪ শতক জমিতে ১ মণ ধান হলেও এবছর ওই ৪ শতক জমিতেই ২ মণের উপরে ফলন হয়েছে। বাম্পার ফলন পেয়ে খুশি কৃষকেরা।

কমলেশ আরও জানায়,  সরকারের কৃষি বিভাগ থেকে কর্মকর্তারা আমন চাষিদের প্রতি বিশেষ নজর দেয়ায় এবং সঠিক সময়ে সকল কৃষি উপকরণ হাতের কাছে পাওয়ায় তাদের চাষাবাদে কোন সমস্যা হয়নি। বাম্পার ফলনের পরেও আমনের বাজার দাম নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন কমলেষসহ অনেক চাষিরা। কারণ, আমনের স্থানীয় বাজারমূল্য মণপ্রতি ৬৫০ থেকে মাত্র ৭শ টাকা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে চাষিরা।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৩০ হেক্টর জমি নিয়ে মোট ১হাজার হেক্টর জমিতে এবছর আমন আবাদ করেছেন চাষিরা।

এই উপজেলা আমনের আবাদ খুবই কম ছিল। তবে পর্যায়ক্রমে আবাদ বাড়ছে।  আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ব্রি-৭৭ হেক্টর প্রতি ফলন হয়েছে সাড়ে পাঁচ মেট্রিক টর ও ব্রি-৫২ ফলন হয়েছে ৫দশমিক ২টন। ধান কাটার ভরা মৌসুম শুরু হয়েছে। তবে আমনের স্থানীয় বাজার দর নিয়ে তিনিও অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, গত বছর ও তার আগের বছর  বোরো ধানের সময় কৃষক সরকারের কাছে ধান বিক্রি করে লাভবান হয়েছিল।

খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে ধান কিনলেও গুদাম কর্মকর্তার তালবাহানা ও বিভিন্ন কারসাজিতে এবছর সরকারের কাছে কৃষকেরা সরাসরি উল্লেখযোগ্য ধান বিক্রি করতে পারেনি। আমন ক্রয়ের জন্য সরকারের সিদ্ধান্ত থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তা বাস্তবায়নের জন্য নজরদারি বাড়ানোর জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি।