১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি বাহিনীর কবল থেকে যেসব এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।
পিরোজপুর:আজ ৮ ডিসেম্বর পিরোজপুর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে অগ্রসরমান মুক্তিবাহিনীর সংবাদে ভীত হয়ে পিরোজপুর থেকে পাক হানাদার বাহিনী পালিয়ে যায়। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিযুদ্ধের ৯নং সেক্টরের সুন্দরবন সাব সেক্টর কমান্ডার তত্কালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দিন আহমেদ-এর নির্দেশে পিরোজপুরের হুলারহাট রাস্তা দিয়ে সুবেদার আবেদ আলী খান, পাড়েরহাটের গাজীপুরের রাস্তা দিয়ে ইয়ং অফিসার শামসুল হক খান এবং কদমতলা রাস্তা দিয়ে হাবিবুর রহমান সিকদারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা শহর অভিমুখে আসতে থাকেন। এ খবরে পাকবাহিনী ভীত হয়ে পিরোজপুর ত্যাগ করে। এ দিবস উপলক্ষে পিরোজপুর জেলা শহরে মুক্তদিবস উদযাপন কমিটি বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
পটুয়াখালী: দীর্ঘ আট মাস অবরুদ্ধ থাকার পর মিত্র বাহিনীর সহায়তা ছাড়াই মুক্তিবাহিনী একে একে থানাগুলো দখল করে জেলা সদরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। পাক হানাদার বাহিনী এতে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে একাত্তরের ৭ ডিসেম্বর রাতে পটুয়াখালী শহরে নিষ্প্রদীপ কারফিউ জারি করে লঞ্চযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে সদলবলে পালিয়ে যায়। পরদিন ৮ ডিসেম্বর সকালে মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে প্রবেশ করে শহরের অভ্যন্তরে। প্রশাসন আনুগত্য প্রকাশ করে, মুক্তযোদ্ধারা নিয়ে নেয় নিয়ন্ত্রণভার। এইদিনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা।
মৌলভীবাজার: ১৯৭১ সালের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্বারা মরণপণ লড়াই করে পাক হানাদার বাহিনীকে মৌলভীবাজার থেকে বিতাড়িত করে শত্রুমুক্ত করেছিল। তবে এর আগে হানাদার বাহিনীর সাথে লড়াই করে নিহত হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাসহ শতাধিক নারী-পুরুষ- শিশু। জানা যায়, ৩০ এপ্রিলের পর থেকে পাকিস্থান হানাদার বাহিনী ৭ ডিসেম্ব্বর পর্যন্ত মৌলভীবাজারে হত্যা করেছিল অর্ধশতাধিক মুক্তি যোদ্ধাসহ অগণিত নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে। শত শত নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছিল দেশীয় রাজাকারদের সহায়তায় হানাদার বাহিনী। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বহুমুখী মরণপণ লড়াই ও ভারতের সীমান্ত থেকে মুক্তি বাহিনী ক্রমশ ক্যাম্প অভিমুখে এগিয়ে আসার খবরে পাক বাহিনী ভীত হয়ে পড়ে। অবস্থা বেগতিক দেখে ৬ ডিসেম্ব্বর ভোরে মনুব্রিজসহ বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস করে পালিয়ে যায় এবং অনেকটাই বিনা যুদ্ধেই মুক্ত হয় মৌলভীবাজার শহর। উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
চাঁদপুর: ১৯৭১ সালের এ দিনে চাঁদপুর পাক হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্তি পেয়েছিল। চাঁদপুর থানার সামনে বিএলএফ বাহিনীর প্রধান মরহুম রবিউল আউয়াল কিরণ প্রথম চাঁদপুরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। ভারতের মাউন্টেন ব্রিগেডও ইস্টার্ন সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ আক্রমণ চালায়। এ সময় পাকিস্তান ৩৯ অস্থায়ী ডিভিশনের কমান্ডিং অফিসার মেজর জেনারেল রহিম খানের নেতৃত্বে দু’টি জাহাজে করে নৌ-পথে ঢাকার উদ্দেশ্যে চাঁদপুর থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর ট্যাংক ও বিমান আক্রমণে চির কবর রচনা হয় নদীতে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ১৯৭১-এর আজকের এই দিনে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর। ৬ ডিসেম্বর আখাউড়া উপজেলাকে শত্রুমুক্ত করার পর মুক্তিবাহিনীর একটি অংশ দক্ষিণ দিক থেকে, মিত্রবাহিনীর ৫৭তম মাউন্টের ডিভিশন আখাউড়া-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেললাইন ও উজানিসার সড়ক দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শহরের চারপাশে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী শক্ত অবস্থানে থাকায় হানাদার বাহিনী পালিয়ে যাওয়ার সময় ৬ ডিসেম্বর রাজাকারদের সহায়তায় নির্মম হত্যাকাণ্ড চালায়। সে সময় তত্কালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের অধ্যাপক কে.এম লুত্ফুর রহমানসহ কারাগারে আটকে রাখা অর্ধশত বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষকে পৌর শহরের কুরুলিয়া খালের পাড়ে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানীরা। পরদিন ৭ ডিসেম্বর রাতের আঁধারে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সদস্যরা শহর ছেড়ে আশুগঞ্জের দিকে পালাতে থাকে। ফলে ৮ ডিসেম্বর বিনাযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী সদ্যরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে প্রবেশ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে মুক্ত ঘোষণা করে।
ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া): ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকহানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে মিত্রবাহিনীর সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধারা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারাকে শত্রুমুক্ত করে। এই দিন ৮নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর আবুল মুনছুর ও জেলা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা রাশেদুল আলমের নেতৃত্বে ২ ভাগে বিভক্ত হয়ে ভোর ৭টার সময় ভেড়ামারা ফারাকপুরে পাকহানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। প্রায় ৭ ঘণ্টাব্যাপী এই যুদ্ধে ৮জন পাকসেনা নিহত হয়। এখানে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকহানাদার বাহিনীর মধ্যে অন্তত ১৫টি খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এসব যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর দুর্বার প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দিয়ে পাকহানাদার বাহিনী পালিয়ে যায়।