দায়িত্বশীলদের কারণেই দখলমুক্তি হয় না

এক দরবেশ চলিয়াছেন একটি রাজ্যের মধ্য দিয়া। সঙ্গে তাহার এক সাগরেদ। রাজ্যখানা দেখিয়া সাগরেদের ভারি পছন্দ হইল। কিছুদিন থাকিবার পর দরবেশ বলিলেন, যে দেশে সবকিছুর দাম একই, আমি সে দেশে থাকিব না। কিন্তু শিষ্য দরবেশকে বলিল, বাবাজি, আমি থাকিয়া যাই? দরবেশ রাজি হইলেন এবং সাগরেদকে রাখিয়া চলিয়া গেলেন। ভালোই চলিতেছিল সাগরেদের, কিন্তু বিপত্তি বাধিল সেই রাজ্যের একটি বাড়ির দেওয়াল ভাঙিয়া একজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটিলে। রাজা জানিতে চাহিলেন, দেওয়াল ভাঙিল কী করিয়া! উজির জানাইলেন, দেওয়াল যে রাজমিস্ত্রি বানাইয়াছে সে যত্ন সহকারে বানাই নাই। ডাকা হইল তাহাকে। সে জানাইল, জাহাঁপনা, কাজ করিবার সময় এক বাঁশরিয়া বাঁশি বাজাইতে বাজাইতে রাস্তায় চলিতেছিল। আমি তাহার সুর শুনিয়া বিমোহিত হই এবং কাজে মনোযোগ হারাইয়া ফেলি। সুতরাং ইহার জন্য বাঁশরিয়া দায়ী। রাজা বলিলেন, ডাকো তাহাকে। বাঁশরিয়া আসিয়া বলিল, হুজুর, আমার বৃদ্ধা মা অসুস্থ। তাহার চিন্তায় বিষণ্ন থাকার কারণে বাঁশি বাজাইয়াছি। রায় হইল, তাহা হইলে উহার মা-ই এই দেওয়াল ভাঙিয়া পড়িবার কারণ। বৃদ্ধাকে লইয়া আসিলে পারিষদ বলিল, মহিলা অশীতিপর বৃদ্ধা এবং ক্ষীণ হুজুর, রাজার শূলে চড়াইবার উপযুক্ত নহে। এককাজ করিলে হয়, উহার বদলে একজন মোটাতাজা লোক ধরিয়া শূলে চড়াইলে সঠিক বিচার হয়। রাজা আদেশ দিলেন মোটাতাজা লোক ধরিয়া আনিতে। অতএব সৈন্যরা গিয়া মোটাতাজা দেখিয়া ধরিয়া আনিল দরবেশের শিষ্যকে। শূলে চড়ানো হইবে এমন সময় সেই পথ দিয়া ফিরিতেছিলেন দরবেশ। তিনি পরিস্থিতি দেখিয়া রাজাকে গিয়া বলিলেন, আমি দিনক্ষণ গুনিয়া দেখিয়াছি, আজ যিনি শূলে চড়িবেন তাহার জ্ঞাতিগুষ্টি সকলে মিলিয়া স্বর্গে দাখিল হইবেন। এইবার রাজা নিজেও আর স্বর্গে গমনের লোভ সামলাইতে পারিলেন না। তিনি সিংহাসন হইতে লাফাইয়া উঠিয়া বলিলেন, তোমরা আমাকে শূলে চড়াও! রাজাই শূলে চড়িবার মনস্থ করিলেন!

নিশ্চয়ই দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অবস্থা রাজার মতো হইয়াছে! নদী রক্ষা কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, দেশের নদনদী দখলের প্রাথমিক তালিকায় ৪২ হাজার ৮২৩ জনের নাম উঠিয়া আসিয়াছে। সেই তালিকায় ক্ষুদ্র দোকানদার হইতে শুরু করিয়া শিল্পপতি এবং রাঘব-বোয়ালদের নাম রহিয়াছে। শুধু নদী-নালাই নহে, দখলের কবলে পড়িয়াছে খাল-বিল-হাওর-জলা যেইখানে যাহা রহিয়াছে। দেশে বালু উত্তোলন লইয়া চলিতেছে যথেচ্ছাচার। অথচ দেশের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় রহিয়াছেন সংসদ সদস্য, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানগণ। কাহার মাথায় কয়টা মাথা যে এইসকল স্থানীয় প্রতিনিধিরা না চাহিলেও এইসব নদী খাল জলা এবং এইসকল স্থানের প্রান্ত দখল করিবেন? প্রতিটি জেলায় সরকারের জেলা প্রশাসক, প্রতিটি উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা রহিয়াছেন। তাহাদের সকলের চক্ষুর সম্মুখে এইসব জায়গা দখল করিবেন কাহার সাধ্য! এইজন্য দায়িত্বশীলরাই কি দায়ি নহেন?

অনুমান করিতে মোটেই কষ্ট হইবার কথা নহে যে এইসব জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের নানাবিধ দুর্বলতার কারণে, তাহাদেরই যোগসাজশে অথবা সম্মতির কারণে ঐ দখলদাররা ধৃষ্টতা দেখাইতে পারেন। স্বর্গের লোভ না করিয়া এইসব সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অর্পিত দায়িত্ব দৃঢ়তার সঙ্গে পালন করিলেই কেবল দখলমুক্তি সম্ভব। নচেত্ দখলমুক্ত করিবার পথ অনেক দীর্ঘ, সুদূর পরাহত থাকিয়া যাইবে।