পরিযায়ী মন চায় পরিপূর্ণ শরত্

ক্যালেন্ডারের পাতায় এখন শরত্। এক-দুই মিনিট করে প্রতিদিনই খাটো হচ্ছে বেলা। পরিপূর্ণ একটা বিকেল এখন আর পাওয়া যায় না। শেষ বিকেল আর আসন্ন সন্ধ্যা প্রায় একই রকম। বিকেল শেষ না হতে কখন যে ঝপ করে নেমে আসে সন্ধ্যা! তবে সেই সন্ধ্যার অন্ধকারে কোনো পানকৌড়ি কিংবা বাদুড়ের ঘরে ফেরা দেখার সৌভাগ্য হয় না আমাদের। ভাবছেন বাদুড় এমন কী সুদৃশ্য প্রাণী যা দেখা সৌভাগ্যের। বিশ্ব পরিবেশ বিপর্যয়ের এই দুঃসময়ে বাদুড়ের দেখা পাওয়া অবশ্যই সৌভাগ্যের। বাদুড় প্রকৃতির উচ্ছিষ্টভোগী উপকারী প্রাণী। মানুষের জন্য ক্ষতিকর এমন অনেক কীটপতঙ্গ মশা বাদুড়ের খাবার। যেসব কীটপতঙ্গ মানুষের জন্য প্রাণঘাতী, বাদুড় সেসব খেয়ে সাবাড় করত বলেই ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, চিকনগুনিয়া, ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা বহুদিন শোনা যায়নি। এই ভাইরাসগুলি তখনো ছিল কিন্তু বাদুড় ও শকুনের মতো উপকারী প্রাণী থাকায় আমরা মুক্ত থেকেছি সেসব থেকে। বাদুড়, শকুন থাকবে কোথায়? কত লক্ষ মহিরুহ যে আমরা কেটে ফেলেছি! একটি মহিরুহের গোড়ার দিকে গর্ত করে আশ্রয় নেয় সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর। তার ওপর আশ্রয় নিত কাঠঠোকরা, মাছরাঙা, টিয়া, শালিক, বুলবুল। তারও ওপরে থাকত বাদুড়-চামচিকা। তার ওপরের অংশে  হুতুমপ্যাঁচা, শঙ্খচিল, শকুন। সবার ওপর বাজপাখি। উড়ন্ত কীটপোকা ধরতে সুঁইচোরাদের জুড়ি মেলা ভার। খেতখামারের ফসল অনিষ্টকারী কীটপতঙ্গ খেয়ে কৃষকের কত যে উপকার করেছে এসব সুঁইচোরা পাখি। কোথাও কি দেখেন সেসব নীল লেজ সুঁইচোরা পাখিদের? যে কটি মহিরুহ অবশিষ্ট আছে তা প্রায় হাতে গুনে শেষ করা যায়। যে কটি খাল-বিল আছে তাও। নির্বিচারে ধ্বংসের পর নগরীর সেই অবশিষ্ট খাল-বিল নালা ডোবা ক্যানালের পাশে ফুটে থাকতে দেখা যাচ্ছে কাশফুল। ব্যস, এটুকুই শরতের শেষ অবশিষ্ট চিহ্ন এখন। এই খাটো বেলা এই কাশফুল এই দুটি অনুষঙ্গ কেবল মনে করিয়ে দিচ্ছে শরত্ এসেছে। নইলে অন্তত এই নগরে গ্রীষ্মের সঙ্গে শরতের পার্থক্য করা কঠিন। কত দ্রুত বদলে গেছে শরত্! শরত্ ছিল শিশির আর শিউলির গন্ধে ভরা। পদ্মবনে অফুরান পদ্ম ফোটার ঋতু। এখন পদ্মবন তো দূরের কথা পদ্ম ফুলেরই অভাব। পূজার অনিবার্য উপকরণ পদ্ম ফুলের অভাবে নিছক কিছু পদ্মের পাপড়ি দিয়ে পূজা সারতে হচ্ছে পূজারিদের। পদ্মবন এখন নিছক কল্পনা। বকুলেরও ঝরে পড়ার ঋতু শরত্। ব্যাকুল বকুলের ফুলে ভ্রমর মরে পথ ভুলে, আকাশে কী গোপন বাণী, বাতাসে করে কানাকানি। বনের অঞ্চলখানি পুলকে ওঠে দুলে দুলে। ঝাঁক ঝাঁক জলচর পাখি থাকত শরতের নির্মল নীল আকাশে। মাছরাঙা আর বকের পাখায় ঝিকমিক করত আকাশ। জলাভূমিতে দেখা যেত ইয়েটসের প্রিয় বুনো রাজহাঁস। কোথায় শরতের সেই স্বচ্ছ নীল নির্মল আকাশ? নগরীর উঁচু উঁচু দালানে ঢেকে গেছে তা। কোথায় শরত্ সকালের ঈষত্ হিম হাওয়া? মাঝে মাঝে মিহি জলরেখার গোটরেইন (ছাগল তাড়ানো) হঠাত্ বৃষ্টি মনে করিয়ে দেয় এখন শরত্। তবে এই ছিটেফোঁটা, ছেঁড়াখোঁড়া এক টুকরো শরতে মন ভরে না। শরত্ এমন এক ঋতু, যখন প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর মন পরিযায়ী হয়ে ওঠে ‘হেথা নয় হোথা নয়, অন্য কোথাও অন্য কোনখানে’। নজরুলের মতো বিদ্রোহী কবিও শরতে লিখেছেন, শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ রাতের বুকে ঐ, এমনও রাতে একলা জাগি, সাথে জাগার সাথী কই? এখন আর শরতের পরিযায়ী মন তৈরির সেই আবহ নেই। কয়েক বছর ধরে পরিযায়ী পাখির দলও আসে একটু দেরি করে। শরত্ ঠিক শরতের আবহে না থাকলে পরিযায়ী স্পৃহা তৈরি হয় না। পাখির দল তাই দেরি করেই আসে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে সারা পৃথিবীতেই বদলে গেছে শরতের আবহাওয়া। ‘হলুদ বোঁটা শেফালির কোনো এক নরম শরতে ঝরিবে লাল লাল বটফুল, শালিখ খঞ্জনা উড়ে যাবে দূরে’। জীবনানন্দের ভাষায় শরত্ সকালকে এখন আর নরম বলার সুযোগ কোথায়? রীতিমতো জ্যৈষ্ঠের গরম।       

n লেখক : নিবন্ধকার