‘তোক মুই প্রথম দেখনু। ইচ্ছা কচ্ছে বুকত নেও। মরার কাঁটাতারের বেড়াখান তাও দিলনি। ভালো থাকিস নানু ভাই।’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন আরতি রানী (৫৩)। তিনি নাতিকে দেখতে ছুটে গিয়েছিলেন সীমান্তে। নাতির সঙ্গে দেখা হলো, কথাও হলো। কিন্তু তাদের মিলনে বাধা হয়ে দাঁড়াল মাঝখানের কাঁটাতারের বেড়া।
ঠাকুরগাঁও জেলার কোঁচল ও চাঁপাসার এবং ভারতের নাড়গাঁও ও মাকারহাট সীমান্তে শুক্রবার বসেছিল দুই বাংলার মানুষের মিলনমেলা। ক্ষণিকের জন্য হলেও দীর্ঘদিন পর দুই দেশের মানুষ স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হন, বিদায়ের সময় আবেগে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকেই।
সীমান্ত এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই দেশের সাধারণ লোকজন যারা অর্থাভাবে পাসপোর্ট-ভিসা করতে পারেন না, তারা এই দিনটির অপেক্ষায় থাকেন। স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে আসা সৈয়দপুর উপজেলার বাসিন্দা মরিয়ম বেগম (৫০) জানান, এবার দেখা করেছেন তার ছোট বোন সেফালীর সঙ্গে। ১৬ বছর আগে সেফালীর বিয়ে হয় ভারতের মাল্দা জেলার চানমুনী গ্রামে। বিয়ের পর এই প্রথম বোন ও বোনের স্বামীর দেখা পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে তার বোন ও বোনের ছেলে-মেয়ে ও স্বামীকে কাপড় এবং মিষ্টি উপহার দেন।
দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার প্রতীমা রাণী (৬০) জানান, ২০ বছর পূর্বে আমার ছোট মেয়ে কমলারাণীর বিয়ে হয় ভারতের গোয়ালপুকুর থানার পাঁচঘরিয়া গ্রামে। বিয়ের পর আর কথা হয়নি তার সঙ্গে। কিন্তু আজ মেয়ের সঙ্গে কাঁটাতারের এপার-ওপারে দাঁড়িয়ে কথা বলে এবং মিষ্টি ও কাপড়-চোপড় দিতে পেড়ে মনে বড় আনন্দ পেয়েছি।
পাথরকালী মেলার সভাপতি নগেন চন্দ্র পাল বলেন, কয়েক যুগ ধরে গোবিন্দপুর গ্রামে কালীপূজার আয়োজন করছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। আর কালীপূজার পরের শুক্রবার ওই এলাকায় বসে মেলা। মেলা ঘিরে প্রতিবছর এক দিনের জন্য সীমান্তের কাঁটাতারের কাছে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত্ করার সুযোগ করে দেওয়া হয়।
গতকাল সীমান্ত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভারতে বসবাসকারী আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে সকাল ৯টা থেকে মেলায় ভিড় জমিয়েছেন বাংলাদেশের কয়েক হাজার নারী-পুরুষ। তারা মেলায় ঘুরে ঘুরে জিনিসপত্র কিনছেন। পরে বেলা সোয়া তিনটা থেকে দেড় ঘণ্টা তারা স্বজনদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন। বিনিময় করেন কাপড় ও খাদ্য।