বস্তুত দুর্ঘটনার পর উড়োজাহাজের যে জিনিসটা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়, সেটা হলো ব্ল্যাক বক্স (Black Box)। যেভাবেই বলি না কেন এর সঙ্গে দুর্ভাগ্য জড়িত থাকে। এটার প্রয়োজন এই প্রেক্ষাপটে হয় যে, উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় সাধারণত কেউ বেঁচে থাকে না। সেহেতু দুর্ঘটনার কারণ জানতে ব্ল্যাক বক্সের বিকল্প নেই। অনেকে আবার এটাকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক বলে অভিহিত করে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে প্লাসপয়েন্ট হলো, একদিকে এর কারণ জানা যায় এবং অন্যদিকটা হলো সংঘটিত সত্যিকার কারণের সকল প্যারামিটারগুলো এর থেকে বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ বা এড়ানোর পথ সুগম হয়।
আধুনিক ব্ল্যাক বক্স হলো খুবই মজবুত এবং হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার অধিক সহনশীল ছোটো-খাটো বাক্স। তাছাড়া অভিকর্ষের চাপের ৩৪০০ গুণ বেশি চাপ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। এটি দুই ধরনের তথ্যাদি রেকর্ডিংয়ের নিমিত্ত তৈরি একটি যন্ত্র বললে হয়তো ভুল হবে না। এর একটি হলো ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার এফডিআর (FDR), অন্যটি হলো ককপিট ভয়েস রেকর্ডার সিভিআর (CVR)। সাধারণত “এফডিআর” এর মাধ্যমে বিমানের ভেতর ও সংলগ্ন পরিবেশের নানা রকমের শব্দ, তাপ ও চাপের পরিবর্তনের হিসাবমূলক তথ্যাদিসহ অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের ডাটা রেকর্ড হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে “সিভিআর” এর দ্বারা ককপিটের ভেতরে পাইলটদের নিজেদের কথাবার্তাসহ তাঁদের সঙ্গে অন্যান্য কেবিনক্রুদের কথোপকথন এবং একইসঙ্গে বিমান চলার প্রাক্কালে যে সকল এয়ারপোর্ট পথে পড়ে, সেই এয়ারপোর্টের সঙ্গে রেডিও কমুনিকেশন রেকর্ড হয়ে থাকে। বস্তুত এফডিআর এবং সিভিআর একসঙ্গে রাখা হয়। আবার বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে অনেক সময় কিছুটা দূরে পৃথক পৃথকভাবে সংরক্ষণ করাও হয়ে থাকে।
১৯০৩ সালে রাইট ব্রাদার্স কর্তৃক উড়োজাহাজ আবিষ্কারের প্রাক্কালে এই রেকর্ডার সংযোজন বা প্রবর্তনের পর কালের পরিক্রমায় অনেক আটঘাট বেঁধে ষাটদশকে তথ্য ধরে রাখার জন্য ব্ল্যাক বক্সে ম্যাগনেটিক টেপ ব্যবহার করা হতো। সময়ের ব্যবধানে এই বক্সে ম্যাগনেটিক টেপ ব্যবহার রহিত হয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সলিড টেস্ট মেমোরি বোর্ড সংযোজিত হয়। অবশ্য এর পেছনে কারণ হলো সলিড স্টেট মেমোরি অনেক বেশি নির্ভরশীল। কেননা ম্যাগনেটিক টেপের ফিতা বা টেপ সব সময়ই নড়তে-চড়তে থাকে এবং এক পুলি থেকে অন্য পুলিতে ঘুরতে থাকে। আর এর ফলশ্রুতিতে দুর্ঘটনার সময় এটি ছিঁড়ে বা সরে যাবার সম্ভাবনা থাকে। অথচ সলিড স্টেট মেমরি বোর্ড পদ্ধতিতে এই ঝামেলা বা জটিলতা নেই বললেই চলে। এতে অনেকগুলো মেমোরি ডিভাইস পরস্পর বিশেষ বিন্যাসে সাজানো থাকে। আর মেমরি চিপগুলো রেকর্ডারের ভেতরে একটা সিলিন্ডার আকৃতির কম্পার্টমেন্টের মধ্যে থাকে।
বিষয়টি খুবই জটিল। এফডিআরের তথ্যাদি যোগানের ব্যাপারে সারা বিমানের নানা স্থানে সেন্সর ফিক্সড করা থাকে। আর এই সেন্সরগুলো উড়োজাহাজের বাইরের এবং ভেতরের তাপ ও চাপ, গতিবেগ, ত্বরণ, ফ্লাইয়িং সেটিং, উচ্চতা ইত্যাদি নানা ধরনের বিষয়াদি তথা প্যারামিটার মেপে, তা রেকর্ডারে প্রেরণ করে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে, সলিড স্টেট রেকর্ডার যেখানে ৭০০-র বেশি প্যারামিটার মাপতে পারে, সেখানে ম্যাগনেটিক টেপ রেকর্ড মাত্র ১০০ প্যারামিটার মাপার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এতে যতবেশি প্যারামিটার মাপা যায়, ততই দুর্ঘটনার কারণ শনাক্ত করার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়। যাহোক, সেন্সরগুলো থেকে তথ্যগুলো প্রথমে উড়োজাহাজের সামনে অবস্থিত সংগ্রহ ইউনিটে যায় এবং তত্পর সেখান থেকে অটোমেটিক এফডিআরে এসে জমা হয়। অন্যদিকে সিভিআরে কিভাবে কার্যক্রম চলে? এতদসংক্রান্ত তথ্যাদি সংগ্রহের ব্যাপারে ককপিটস্থ পাইলটের হেডসেট ও কো পাইলটের হেডসেট, তৃতীয় ক্রু মেম্বারের ঠিক মধ্যখানের স্থানগুলোতে মাইক্রোফোন রাখা থাকে। পাইলটদের কথাবার্তা ও পারিপার্শ্বিক নানা শব্দ উক্ত মাইক্রোফোন গ্রহণ করে ইন্টারমেডিয়েট ডিভাইস নামক ইউনিটে পাঠায়। এই ব্ল্যাক বক্স বেশ জটিল কারিগরি বিষয় বিধায় সবকিছু তুলে ধরে বর্ণনা করতে গেলে এর কলেবর অনেক বড়ো হবে। তবে আরো কিছু ছিটাফোঁটা বিষয় উল্লেখ না করলে কমতি থেকে যাবে। যেমন- বিদ্যুতের সরবরাহের বিষয়। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, ব্ল্যাক বক্সের পাওয়ার সরবরাহের জন্য রয়েছে দুটি জেনারেটর। একটি হলো ২৮ ভোল্ট (DC) এবং অন্যটি হলো ১১৫ ভোল্ট (AC)। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে যে উড়োজাহাজ ক্রাশ হয়ে যত্রতত্র পড়তে পারে; এমনকি পানিতেও। সে ক্ষেত্রেও এর তেমন কোনো সমস্যা হয় না। ধরুন যদি অতল তলে তথা হাজার হাজার ফুট পানির নিচে যেয়েও পড়ে। তাহলেও এটি কাজ করতে সক্ষম। কেননা অত নিচে শনাক্ত করার ব্যাপারে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্য নেওয়া হয়। আর পড়ে যাওয়া এই ব্ল্যাক বক্স থেকে নির্গত অডিও শব্দ অক্ষত থাকে। কিন্তু মানুষের কানে ধরা না পড়লেও উক্ত যন্ত্র দ্বারা খুঁজে বের করা যায়।
n লেখক : গবেষক