আমাদের দিন বদলেছে বটে

আজ থেকে ৬০-৭০ বছর আগের কথা। গ্রামাঞ্চলে তখনো বিনিময় বাণিজ্যই চলত। দোকানিরা বাড়িতে বাড়িতে যেত তাদের পসারি নিয়ে। মানুষ এসব কিনতো ধান, পাট, সরিষা ইত্যাদির বিনিময়ে। বাজারে অবশ্য টাকাপয়সার লেনদেন ছিল। তাও আর কত পরিমাণ টাকা! আমরা গ্রামাঞ্চলে দেখেছি এক পয়সা, পাঁচ পয়সা, দশ পয়সা, পঞ্চাশ পয়সা, বড়োজোর এক টাকা-পাঁচ টাকার (তখন রুপি) মাধ্যমে লেনদেন। একটা এক পয়সা ছিল, যার নাম ছিল কানা পয়সা। কারণ ঐ পয়সাটার মাঝখানে ছিল ছিদ্র। বাজারে যে লেনদেন হতো সেখানে ১০ টাকা পাঁচ টাকা ব্যবহার হতো। ১০০ টাকার নোট বাজারে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তখনকার দিনে একটু ভালো পরলে, ভালো খাওয়াদাওয়া করলে, ইস্তিরি করা জামা পরলে, পায়ে জুতা-স্যান্ডেল থাকলে তাদেরকেই বলা হতো ধনী লোক। রুই-কাতলা-চিতল ইত্যাদি বড়ো মাছ ধনীরাই খেত। গরিব ও নিম্নবিত্তরা খেত ছোটো মাছ। পুঁটি, ট্যাংরা, মৌরলা, কাচকি ইত্যাদি মাছ। টাকাপয়সা ধনদৌলত এমনই দুষ্প্রাপ্য বস্তু ছিল যে, লাখ টাকার মালিক হওয়া ছিল স্বপ্নের বিষয়। গ্রামাঞ্চালে কেউ লাখ টাকার মালিক হলে তার বাড়িতে ঘিয়ের বাতি জ্বালাতে হতো। আর সেই বাতি থাকত শিখা অনির্বাণের মতো। যতদিন লাখপতি ততদিন ঘিয়ের বাতি। লাখপতির গল্প থাকত মুখে মুখে। সাধারণভাবে দেখেছি, কিছুসংখ্যক বড়ো পাটের ব্যবাসয়ীরাই ধনীলোক ছিল। ক্ষয়িষ্ণু জমিদার, তালুকদারদের কথাও হতো। তবে তারা ছিল পড়ন্ত বিকেলের রোদ। এই অবস্থা পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) আমল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অবশ্য আমাদের স্বাধীনতার পূর্বে বেশ কিছু ধনাঢ্য বাঙালি পরিবারের জন্ম হয়। তবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের তুলনায় তারা ছিল নগণ্য। তাই তখন আন্দোলন ছিল পাকিস্তানের ধনাঢ্য অতি ধনী ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে। খুবই জনপ্রিয় আন্দোলন। মাত্র ২২টি পরিবার ছিল ধনী। অতিধনী পরিবার। বলা বাহুল্য, স্বাধীনতার পর ১৯৮০-৮২ সাল পর্যন্ত সময়ের অবস্থার বড়ো একটা পরিবর্তন হয়নি। অনেক টাকার মালিক বাঙালি ছিল কয়জন?

১৯৭৬-৭৭ সালের দিকে সরকারি উদ্যোগে একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান করার কথা যখন হয়, তখন তার পরিশোধিত মূলধন দরকার ছিল মাত্র ৬ কোটি টাকার মতো। কয়েকজন মিলেও সেই টাকার অর্ধেক দেওয়ার মতো অবস্থাও ছিল না। তখন সরকারি ব্যাংক থেকে কায়দা করে টাকা জোগাড় করে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দেওয়া হয়, যাতে তারা প্রতিষ্ঠানটি করতে পারে। তখন কথা উঠল : ব্যাংকের টাকায় ব্যাংক। ১৯৮২-৮৩ সালে যখন বেসরকারি খাতে ব্যাংক করার অনুমতি দেওয়া হয়, তখনো পরিশোধিত মূলধন লাগত মাত্র ৪-৬ কোটি টাকা। বলা বাহুল্য, তা দেওয়ার সামর্থ্যও তখন পর্যন্ত কয়েক বাঙালির ছিল না। তখনো একই কথা : ব্যাংকের টাকায় ব্যাংক হচ্ছে। সেই অবস্থার সঙ্গে আজকের অবস্থার তুলনা করলে কী মনে হয়?

সেই আমলের সঙ্গে আজকের তুলনা করার জন্য গ্রাম থেকেই শুরু করি। কিছুদিন আগে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমার এক বন্ধুর নাতনি পরীক্ষায় ভালো করেছে। সালাম দিতে আসলে আমি তাকে ১ হাজার টাকার একটি নোট দিই। বন্ধুটি নাতনিকে জিগ্যেস করল কত টাকা? সঙ্গে সঙ্গে ও বলে দিল ১ হাজার টাকা। আমি অবাক। এই বাচ্চা মেয়েটি কী করে জানাল এটা হাজার টাকার নোট। পরে জানলাম, ওর কাছে ‘ডলার’ নোটও আছে। বিদেশে থাকা চাচা দিয়ে গেছে। সেই গ্রাম আর নেই। বাংলাদেশের বহু উপজেলা শহরে ১ শতাংশ জমির দাম ১০-১৫ লাখ টাকা। কোথাও কোথাও বেশি। টিনের ঘরবাড়ি নেই। সব পাকা দালান। শহরের মতো সাজানো-গোছানো দোকান। ডজন ডজন স্বর্ণের দোকান—শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। ১০০ টাকার নোট নয় ৫০০-১০০০ টাকার নোট হাতের মুঠোয়। হাতে হাতে মোবাইল ফোন। ঘরে ঘরে মোটরসাইকেল। ঢাকাতে যারা চাকরি-ব্যবসা করেন, তাদের রয়েছে বাগানবাড়ি। লাখ টাকায় কোনো হিসাব নেই। কোটির নিচে কথা নেই। জমির দাম আকাশছোঁয়া। এক বিঘা ধানি জমির দামও কোথাও কোথাও ১০-১৫-২০ লাখ টাকা। তিন-চার বিঘা জমি থাকলেই সেই কৃষক ধনীলোক। গ্রামাঞ্চলের অনেক ধনী যুবক এখন হেলিকপ্টারে বিয়ে করতে যায়। বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার লোক বিদেশে কর্মরত। নিয়মিত ডলার পাঠাচ্ছে তারা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রসূত টাকা এবং রেমিট্যান্সের টাকা সব মিলিয়ে গ্রামে এখন ‘ক্যাশ’ আর ‘ক্যাশ’। মানুষ এখন ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে ‘নেমন্তন’ খেয়ে রাত ১২টায় নিজ বাড়িতে ফেরে। আমরা যে গ্রাম দেখেছি, যে গ্রামে মানুষ হয়েছি, সেই গ্রাম নেই। গ্রামাঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে হাজার হাজার ধনাঢ্য লোক, অতি ধনী লোক। তারা ব্যবসায়-বাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবই নিয়ন্ত্রণ করছে। তাহলে শহর? ৪-৬ কোটি টাকা দিয়ে যেখানে একটা ব্যাংক করার লোক ছিল না, সেখানে ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন দিয়ে ব্যাংক করার লোক আছে শত শত। দেশে এখন লক্ষাধিক প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি আছে। ঢাকা শেয়ারবাজারে সাড়ে পাঁচ শতেরও ওপরে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি আছে। এসবের পরিশোধিত মূলধন সোয়া লাখ কোটি টাকারও ওপরে। বস্ত্রশিল্পে বিনিয়োজিত আছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। তৈরি পোশাক খাতে কারখানা আছে সাড়ে ৪ হাজারের মতো। ব্যাংক-বিমা-লিজিং কোম্পানি মিলিয়ে হবে এক-দেড়শ কোম্পানি। কোম্পানি মানেই রয়েছে উদ্যোক্তা। তাদের নিজস্ব পুঁজি আছে (ইক্যুইটি)। ইক্যুইটি ছাড়া ব্যাংক নতুন শিল্পে ঋণ দেয় না। ঔষধশিল্প, সিমেন্টশিল্প, চিনিশিল্প, প্রকৌশলশিল্প থেকে শুরু করে নানা জাতের কোম্পনি হয়েছে। এদের উদ্যোক্তাদের পুঁজি এখানে বিনিয়োজিত। এখন পাঁচশ, হাজার, পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার মতো কোম্পানি বা ‘গ্রুপ অব কোম্পনি’ একটা-দুইটা নয়; ডজন ডজন কোম্পানি আছে, যাদের ব্যাংকঋণ ৫-৭-১০ কোটি নয়, শত শত হাজার হাজার কোটি টাকা। ঢাকা শহরেই দুই বছর আগে আড়াই লাখের ওপরে প্রাইভেট গাড়ি ছিল। প্রতি বছর ১০-১৫ হাজার গাড়ি যুক্ত হচ্ছে। সারা দেশে ৩০-৪০ লাখ মোটরযান আছে। এসবের উদ্যোক্তা আছে। এসব ব্যবসা লাখ টাকায় হয় না। এখন কোটি টাকায়ও মাঝারি কেন, ছোটো ব্যবসাও হতে চায় না। এখন বড়ো ব্যবসার যুগ, প্রতিযোগিতার যুগ। প্রতিদিন বাংলাদেশে ধনী, অতিধনী জন্ম হচ্ছে। সারাদেশে এখন কত লোক ধনী, কত লোক অতিধনী, তার হিসাব করা কঠিন। লাখপতি, কোটিপতি—এসব কোনো বিষয় নয়। বাঙালি এখন কোটিতে হিসাব করে না। তারা এখন হিসাব করে বিলিয়নে (শত কোটি)। আমাদের বাজেটের হিসাব ট্রিলিয়নে (১ লাখ কোটি)। এই যে পরিবর্তন, তা কী করে সম্ভব হলো? ১৮ কোটি লোকের মধ্যে ২০ শতাংশই এখন মধ্যবিত্ত। বাংলাদেশ এখন নিম্নমধ্য আয়ের দেশ। কিছুদিনের মধ্যে আমরা উদীয়মান বিশ্বের ১১তম অর্থনৈতিক দেশ হব। যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত যুদ্ধ করে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি, সেই পাকিস্তান এখন ১৪০-১৫০ রুপি দিয়ে এক ডলার কেনে। আর আমরা কিনি ৮৫ টাকায়। ১৯৭২ থেকে ১৯৮০ সালে ১০০ টাকা দিয়ে ভারতীয় ৪০ রুপি কিনতাম। আর এখন ৮৫-৮৭ রুপি। ৬০ বিলিয়ন টাকার আমদানি আমাদের। প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি। প্রাবসী আয় বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। রিজার্ভের পরিমাণ ৩৩ বিলিয়ন ডলার। দারিদ্র্যসীমার নিচে লোকসংখ্যা মাত্র ১৮-২০ শতাংশ। ধান-চালে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাছ-মাংস, ফলমূল, তরিতরকারিতে আমরা অভূতপূর্ব অগ্রগতি দেখিয়েছি। শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, সাক্ষরতার হার, পানীয় জল প্রাপ্তি, পায়োনিষ্কাশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য অভূতপূর্ব। বলা বাহুল্য, ৫-৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের স্থলে এখন আমাদের প্রবৃদ্ধির হার সোয়া ৮ শতাংশ। খেলার কথা না!

একথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে, অব্যাহত প্রবৃদ্ধির ফলই হচ্ছে মধ্যবিত্তের বিকাশ, ধনী লোকের বিকাশ, ধনাঢ্য লোকের বিকাশ। এখানে অবশ্য প্রশ্ন আছে একটা। ধনী লোক কাকে বলা হবে? এর সংজ্ঞা কী? সংজ্ঞা নেই। তবে কর প্রশাসন একটা সংজ্ঞা ব্যবহার করে। আড়াই কোটি টাকার ওপরে সম্পদ হলেই তিনি ধনী এবং তাকে ১০ শতাংশ সারচার্জ দিতে হবে। এই নিরিখে বিচার করলে বাংলাদেশে এখন হাজার হাজার নয়, লাখ লাখ ধনী লোক। যারা এর অতিরিক্ত সম্পদের মালিক, তারা ‘সুপাররিচ’। আরেকটা প্রশ্ন, ধন-সম্পত্তি করা কি অপরাধ? বাঙালি ধন-সম্পত্তির মালিক হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সমাজ এখনো এন্টি-মানি। মনোজাগতিক এই অবস্থান থেকে বাঙালির সরে আসতে সময় লাগবে বলে মনে হয়। তা লাগুক, ইত্যবসরে আইনের মধ্যে কর পরিশোধ করে মেধা, দক্ষতা ও প্রতিযোগিতার মধ্যে কেউ ধনী হলে আপত্তি করার কী আছে? তবে নগ্ন বৈষম্যের কথা মনে রাখতে হবে, যার কথা আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন ইকোনমিস্ট তার সর্বশেষ সংখ্যার সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছে। বলা হয়েছে, পুঁজিবাদের বিপক্ষ শক্তি হচ্ছে বৈষম্য।

n লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়