বিশ্বরাজনীতিতে লোকরঞ্জনবাদের জোয়ার

পপুলিজম বা লোকরঞ্জনবাদের আভিধানিক অর্থ বিবেচনায় নিলে অনেকটা এরকম ‘টু সাপোর্ট দ্য অর্ডিনারি পিপল’ বা সাধারণ জনগণের স্বার্থকে সমর্থন করা। কিন্তু বর্তমানে লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতিবিদদের মধ্যে এর ভিন্নতাও লক্ষণীয়। লোকরঞ্জনবাদীরা সাধারণত জনগণের আবেগ, বঞ্চনা বা হতাশাকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখায়। বাস্তবায়ন করা যাবে কি না তা বিবেচনা না করে জনগণকে ঢালাওভাবে শ্রুতিমধুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করে। কৌশল হিসেবে প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ায়। তারা যা বলে তার পক্ষে তথ্যপ্রমাণ হাজির করার কোনো ব্যাপার থাকে না। কিছু শক্রকে তারা নির্দিষ্ট করে দেয় এবং দেশ বা জনগণের যে কোনো সমস্যা, ক্ষতি বা বিপদের জন্য তাদেরকেই দায়ী করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এজন্য নির্দিষ্ট কোনো বিদেশি শাসক কিংবা ঐ দেশের জনগণকে তাদের দেশের সব অঘটনের জন্য দায়ী করা হয়। দায়ী দেশের ওপর শক্তি প্রয়োগ করে নিজ দেশে পপুলারিটি অর্জন করতে চায় লোকরঞ্জনবাদীরা। তারা ধর্মকে ব্যবহার করে জাতীয়তাবাদ এবং উগ্রবাদকে উসকে দেয়। ধর্মে বিশ্বাসী সকল মানুষের কাছেই ধর্মীয় অনুভূতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। লোকরঞ্জনবাদীরা সেই সুযোগটিও খুব ভালোভাবেই কাজে লাগায়। ধর্মীয় অনুভূতিকে উপলক্ষ্য বানিয়ে অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে এক দলকে অন্য দলের প্রতি লেলিয়ে দেয়। ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক হিন্দু। এই হিন্দুদের ভোটই যদি মোদি সরকার পায় তাহলে বিনা দ্বিধায় সে নির্বাচিত। কাশ্মীরকে কেন্দ্রীয় শাসনের অন্তর্ভুক্ত করা মোদি সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল। এর মাধ্যমে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠরা খুশি। এটিকেও পপুলিজমের উদাহরণ থেকে বাদ দেওয়া যায় না। জম্মু কাশ্মীর যেহেতু ভারতের অধীনে তাই এটিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ই বলা চলে। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এই ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে খুব উত্তাপ ছড়াচ্ছেন। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করে পাকিস্তান কতদূর যেতে পারবে তা ভালো করেই জানে ইমরান খানের সরকার। তবুও হুমকি-ধমকি দিয়ে কথা বলে শক্তিমত্তা জাহির করছেন ইমরান। কাশ্মীর স্বাধীন হোক বা না হোক তাতে কী? ইমরান খানের গ্রহণযোগ্যতা কিন্তু পাকিস্তানে ঠিকই বাড়ছে। যাকে লোকরঞ্জনবাদ কিংবা পপুলিজমের প্রকৃষ্ট উদাহরণই বলা চলে। ইমরান খানের দিকে যদি আমরা আরেকটু লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব তিনিও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগিয়ে রাজনীতি করছেন। নির্বাচিত হওয়ার আগে-পরে ‘পাকিস্তান চলবে মদিনার রাষ্ট্রনীতিতে’ বলে ঘোষণা দিলেও এমন কোনো আলামত আমরা এখনও পর্যন্ত লক্ষ্য করিনি। এই কৌশলকেও কি পপুলিজমের বাইরে ফেলা যায়? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে তাকালেও একই চিত্র ফুটে ওঠে। শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদ ছড়িয়েছেন তিনি আমেরিকায়। অভিবাসীদেরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়া, মুসলমানদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার ব্রতী গ্রহণ করেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এখন তা একেবারেই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যও এক মহা নাটকে অবতীর্ণ। প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র পদত্যাগ হলেও ব্রেক্সিট এখনও বাস্তবতার মুখ দেখেনি। সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মিয়ানমারের অং সান সু চি। এর মাধ্যমে তিনিও নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করেছেন। জনপ্রিয় হয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের কাছে। এমনিভাবে ইজরায়েলের বেনি আমিন নেতানিয়াহু, ব্রাজিলের জেইর বলসোনারো, চীনের শি জিনপিংসহ আরো বহু দেশের বহু রাজনীতিকেরা হাঁটছেন এই একই পথে। ধর্মীয় উগ্রবাদী মতবাদ ছড়িয়ে, সংখ্যালঘুর ওপর অত্যাচার করে কিংবা কথার ফুলঝুরি দিয়ে তারা তাদের ক্ষমতাকেই পাকাপোক্ত করছেন। যা কখনোই গণতান্ত্রিক ধারা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়