দশম সংসদে কোরাম সংকটে ক্ষতি ১৬৩ কোটি টাকা

দশম জাতীয় সংসদে কোরাম সংকটের কারণে প্রায় ১৬৩ কোটি ৫৭ লাখ ৫৫ হাজার ৩৬৩ টাকার অপব্যবহার হয়েছে। ওই সংসদের ২৩টি অধিবেশনে কোরাম সংকট ছিল ১৯৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। যা ওই সংসদের মোট সময়ের মাত্র ১২ শতাংশ। যদিও আগের কয়েকটি সংসদের তুলনায় দশম সংসদে কোরাম সংকট কিছুটা হ্রাস পায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘পার্লামেন্টওয়াচ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল বুধবার ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এটি দশম জাতীয় সংসদের ২৩টি অধিবেশনের ওপর একটি সমন্বিত প্রতিবেদন, যেখানে সংসদের কার্যক্রম ও কার্যকারিতা সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে দশম জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয় এবং ২০১৮ সালের অক্টোবরে শেষ হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৩টি অধিবেশনে গড় কোরাম সংকট ছিল ২৮ মিনিট, যা প্রকৃত মোট ব্যয়িত সময়ের ১২ শতাংশ। সংবিধান অনুযায়ী, ন্যূনতম ৬০ জন সদস্য উপস্থিত না থাকলে সংসদের কোরাম হয় না। কোরাম না থাকলে বৈঠক স্থগিত বা মুলতবি রাখা হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোরামের কারণে ১৬৩ কোটি ৫৭ লাখ ৫৫ হাজার ৩৬৩ টাকা ক্ষতির একটি সম্ভাব্য হিসাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেশের জনপ্রতিনিধিরা যে সময় নষ্ট করেছেন তার প্রকৃত মূল্য আরো অনেক বেশি।

দশম জাতীয় সংসদের মোট সময়ের মাত্র ১২ শতাংশ আইন প্রণয়নে ব্যয় হয়েছে। এই সময়ে ১৯৩টি সরকারি বিল পাশ হয়। অথচ ২০১৭-১৮ সালে যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসে আইন প্রণয়নে সময় ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ এবং ২০১৪-১৯ সালে ভারতের ১৬তম লোকসভায় এই হার ছিল ৩২ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিল উত্থাপন এবং বিলের ওপর সদস্যদের আলোচনা ও মন্ত্রীর বক্তব্যসহ একটি বিল পাশ করতে গড়ে প্রায় ৩১ মিনিট সময় ব্যয় হয়েছে। মোট বিলের ৭১ শতাংশ পাশ হয়েছে ১ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে। যেখানে ভারতের ১৬তম লোকসভায় প্রতিটি বিল পাশে গড়ে প্রায় ১৪১ মিনিট ব্যয় হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত আলোচনাতেই সবচেয়ে কমসংখ্যক সংসদ সদস্য অংশ নেন। গবেষণায় দেখা গেছে, দশম সংসদের ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে আইন প্রণয়ন (বাজেট ব্যতীত) আলোচনায় অংশ নিয়েছেন মাত্র ৯৪ জন। তাদের মধ্যে সরকারদলীয় সদস্য ৭১ জন (২৯০ জনের মধ্যে), প্রধান বিরোধী দলের ১৯ জন (৪১ জনের মধ্যে), অন্যান্য বিরোধী দলের চার জন (১৯ জনের মধ্যে)। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যে আইন পাশ হওয়ার ফলে সংসদ সদস্যরা আইনটি সম্পর্কে ভালোভাবে পড়েছেন কি না তাতে সন্দেহ থেকে যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) গত সংসদ অধিবেশনে তার প্রকৃত দায়িত্ব পালন করেনি। বিরোধী দল সরকারের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা, আর্থিক খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে সরকারের দৃষ্টি আর্কষণ করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদের অংশ হওয়ায় এবং নিজেদের পরিচিতি সংকটের কারণে জোরালো ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। দশম জাতীয় সংসদ সম্পর্কে সার্বিক পর্যালোচনায় ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দশম সংসদে আশা জাগানিয়ার মতো কিছু দেখিনি। প্রকৃত অর্থে বিরোধী দলের অভাবে সংসদ কার্যকর হয়নি।

সংসদকে কার্যকর করতে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে টিআইবি। এর মধ্যে, সংসদ সদস্য আচরণ আইন প্রণয়ন—যাতে সংসদের ভেতরে ও বাইরের আচরণ ও কার্যক্রম সম্পর্কে আন্তর্জাতিক চর্চা অনুসারে নির্দেশনা থাকবে, কার্যকরী বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা অন্যতম।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, টিআইবির উপদেষ্টা, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী নিহার রঞ্জন রায় ও মোরশেদা আক্তার প্রমুখ।