সরকার উত্খাতের ষড়যন্ত্র করছে ‘আল্লাহর দল’!

জঙ্গি সংগঠন ‘আল্লাহর দল’ এর নেতাকর্মীদের নামে সারাদেশে বিভিন্ন ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকার সন্ধান মিলেছে। জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের নামে এত টাকা কিভাবে ব্যাংক একাউন্টে রাখা হয়েছে—তা তদন্ত করতে গিয়ে র্যাব-১ এর অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা ইউনিট রীতিমতো অবাক হয়ে গেছে। সংগঠনটি সরকার উত্খাতের ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে বলেও জানতে পেরেছে র্যাব। গতকাল বুধবার ভোরে রাজধানীর দক্ষিণখান থেকে ‘আল্লাহর দলে’র যুগ্ম অধিনায়ক সিরাজুল ইসলাম শাহবুল মৃধাসহ (৪০) চার জনকে গ্রেফতার করার পর তাদের কাছ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গ্রেফতারকৃত অন্যরা হলেন—মনিরুজ্জামান মনির (৪০), এসএম হাফিজুর রহমান সাগর (৪৫) ও শফিউল মোযনাবীন তুরিন (২৭)। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৩টি পেনড্রাইভ, ১২টি মোবাইল ফোন, সংগঠনের লিফলেট, দাওয়াতপত্র ও আয়-ব্যয়ের হিসাবের একটি টালি খাতা উদ্ধার করা হয়।

গতকাল রাজধানীর কাওরান বাজারস্থ র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে র?্যাব-১ এর অধিনায়ক  লে. কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম  জানান, গ্রেফতার ৪ জন সংগঠনটির আর্থিক মূলধনের একটি বড় অংশ নামে-বেনামে দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংকে গচ্ছিত রেখেছে। মূলত দেশে নাশকতা সৃষ্টি ও সরকার উত্খাতের কাজে এগুলো ব্যয় করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। তাদের কত সদস্য এবং কী পরিমাণ অর্থ রয়েছে সেটির তদন্ত চলছে। তবে অস্ত্র কেনার যে পরিকল্পনা ছিল, তাদেরকে গ্রেফতারের কারণে আপাতত তা বন্ধ থাকছে। দলটির বিরুদ্ধে র্যাবের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান র্যাবের এই কর্মকর্তা।

দলটির প্রতিষ্ঠা যেভাবে

র্যাব জানায়, ‘আল্লাহর দল’ জঙ্গি সংগঠনটি ১৯৯৫ সালে জাতীয় সংসদের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আব্দুল মতিন মেহেদী ওরফে মুমিনুল ইসলাম ওরফে মহিত মাহবুব ওরফে মেহেদী হাসান ওরফে মতিনুল হকের নেতৃত্বে গঠিত হয়। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও সাদুল্লাপুর থানা এলাকা থেকে এই সংগঠনের সদস্য সংগ্রহ করা হয়। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে জেএমবির সিরিজ বোমা হামলার সঙ্গে আল্লাহর দলের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মেলে। ঐ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ধানমন্ডির গ্রিন রোডস্থ সরকারি কোয়ার্টার থেকে র্যাব মতিন মেহেদীকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে মতিন মেহেদী একটি মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে টাঙ্গাইল কারাগারে বন্দি রয়েছে। তার অনুসারীরা মতিন মেহেদীকে কারাগার থেকে আদালতে নেওয়ার পথে প্রিজনভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। মতিন মেহেদীর অনুপস্থিতিতে গ্রেফতার আব্রাহিম আহমেদ হিরো আল্লাহর দলের ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ১৯ আগস্ট রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় র্যাব অভিযান চালিয়ে আব্রাহিম আহমেদ হিরো (৪৬), আবদুল আজিজ (৫০), শফিকুল ইসলাম সুরুজ (৩৮) ও রশিদুল ইসলামকে (২৮) গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে গতকাল ভোরে দক্ষিণখান এলাকা থেকে ঐ চার জনকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার সিরাজুল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদে র্যাবকে জানায়, বর্তমানে যুদ্ধাবস্থা চলছে বিধায় তারা ঈদ, কোরবানি, হজ ইত্যাদি পালন করেন না। জুমার নামাজ আদায় করেন না। প্রতি ওয়াক্তে শুধু দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে সংগঠনের সদস্য হওয়ার পর ‘গ্রাম নায়ক’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পাবনা, ঝিনাইদহ, খুলনা, রাজশাহী ও নওগাঁয় দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে যুগ্ম অধিনায়ক পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বর্তমানে একই দায়িত্বে বহাল আছেন সিরাজুল। তিনি জঙ্গি সংগঠনটির মামলা-মোকাদ্দমাসহ বিবিধ বিষয়াদির তদারকি করেন।

র্যাব-১ এর অধিনায়ক এই প্রতিবেদককে বলেন, অনুকূল পরিবেশে দেশের মধ্যে নাশকতায় লিপ্ত হয়ে গণতান্ত্রিক সরকারকে উত্খাতের মাধ্যমে শান্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার বড়ো ধরনের পরিকল্পনা ছিল দলটির। এছাড়া নিজেদের কাঠামো অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা তাদের মূল লক্ষ্য। তারা ইসলামের অপব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পরিবেশন এবং ভ্রান্ত ইসলামি সংগীতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করে। পাশাপাশি তারা জঙ্গি কার্যক্রমকে জোরদারের জন্য আর্থিক কাঠামো তৈরি করছিল।