রাজধানীর মিরপুরে পানি সরবরাহে গৃহীত ওয়াসার ৫৭৩ কোটি টাকার প্রকল্পে গভীর নলকূপসহ পাম্প বসাইবার জায়গায় কেবল পাইপ বসাইয়াই কাজ শেষ করিয়াছেন ঠিকাদার। ৪৬টি গভীর নলকূপ বসাইবার কথা থাকিলেও ৫টিতে পানি উত্তোলনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিই বসানো হয় নাই। উপরন্তু ৩টিতে কেবল নলকূপের পাইপ বসাইয়া প্রকল্প সমাপ্ত করিয়া বিল তুলিয়া নিয়াছেন ঠিকাদার। ৫৭৩ কোটি টাকার প্রকল্পে ধাপে ধাপে হরিলুট চলিলেও এখনো অধিগ্রহণকৃত জমির অর্থ পরিশোধ করা হয় নাই ক্ষতিগ্রস্তদের। ওয়াসার এই প্রকল্পের মূল ঠিকাদার কোরিয়ার কোম্পানি হুন্দাই রোটেম। তবে তাহাদের নিয়োগকৃত স্থানীয় ঠিকাদার হিসাবে কাজ করিয়াছে অ্যারিডড গ্রুপ। পত্রিকান্তরের সরেজমিন অনুসন্ধানে সাভারের ভাকুর্তা, তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নে দেখা যায়, তেঁতুলঝোড়ায় বসানো ৫টি গভীর নলকূপের সবই বন্ধ। ঝাউচর বাজার, উত্তর মেইটকা, শ্যামপুর, দক্ষিণ শ্যামপুর ও মুসুরিখোলায় স্থাপিত গভীর নলকূপগুলি সীমানাপ্রাচীরে ঘেরা, প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। পাম্পগুলি তৈরির পর হইতে কোনো দিন চালু হয় নাই। আর প্রকল্পের কাজ শেষ হইলেও অধিগ্রহণকৃত জমির মূল্য এখনও পরিশোধ করা হয় নাই। অন্যদিকে, যে কয়টা গভীর নলকূপ চালু হইয়াছে তাহাতেই খাঁখাঁ পরিস্থিতি তৈরি হইয়াছে এলাকা জুড়িয়া। ভাকুর্তার কোনো বাড়ির নলকূপে পানি উঠিতেছে না। ঢাকায় পানি দিতে গিয়া তাহারা তৃষ্ণায় মারিতেছে। ইরি ধানের আবাদ পুরোপুরি বন্ধ।
ওয়াসার মিটার রিডিং, নলকূপ স্থাপন, ভৌতিক বিল, ঠিকাদার নিয়োগসহ ১১টি খাতকে দুর্নীতির উত্স হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছে দুদক। ইহার সহিত দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২টি সুপারিশ করিয়া গত মাসে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর নিকট প্রতিবেদন জমা দিয়াছেন দুদক কমিশনার।
অন্যদিকে সুপেয় পানির পরিবর্তে সরবরাহ করা হইতেছে দুর্গন্ধ ও ময়লাযুক্ত পানি। বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে কোনো সুফল পাননি ওয়াসার গ্রাহকেরা। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না করিয়া বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্পে সময়সীমা ও ব্যয়বৃদ্ধি করা হয়। এক প্রতিবেদন হইতে জানা যাইতেছে, মিরপুরসহ বৃহত্তর এলাকার পানির চাহিদা পূরণকল্পে মিরপুরের ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরতা হ্রাসকরণ প্রকল্পটি ২০১২ সালের ২২ অক্টোবর অনুমোদিত হয়। সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হইবার কথা; কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত না করিয়া অযৌক্তিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ৫২ কোটি টাকা বৃদ্ধি করাও হইয়াছে। অনুরূপ চিত্র অন্যান্য প্রকল্পের বেলায়ও দেখা যাইবে।
পানির জন্য পর্যায়ক্রমে ভূগর্ভস্থ উেসর উপর চাপ কমাইয়া ভূ-উপরিস্থ উেস জোর দেওয়ার কথা বলিতেছে ঢাকা ওয়াসা; কিন্তু বাস্তবে ভূগর্ভস্থ উেস আরো বেশি নির্ভরশীল হইয়া পড়িয়াছে সংস্থাটি। বাড়িতেছে গভীর নলকূপের সংখ্যা। হালনাগাদ তথ্যমতে ওয়াসার পাম্পের সংখ্যা এখন ৯২৮টি। এক বত্সরে পাম্প বাড়িয়াছে ৭৩টি। বর্তমানে ওয়াসার মোট উত্পাদিত পানির ২২ শতাংশ ভূ-উপরিস্থ উত্স হইতে সংগ্রহ করা হয়। অথচ ২০২১ সাল নাগাদ ঢাকা শহরে সরবরাহকৃত পানির ৭০ শতাংশ ভূ-উপরিস্থ উত্স হইতে সংগ্রহের পরিকল্পনা করিয়াছে। গভীর নলকূপগুলি যেমন পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ হইতেছে, উপরন্তু গভীর নলকূপ বসাইবার প্রকল্পগুলি হরিলুটের কারখানায় পরিণত হইয়াছে। এই সকল বিষয়ে সরকার জনবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা গ্রহণ করিবে এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধ কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে বলিয়াই আমরা প্রত্যাশা করি।