পার্লামেন্ট স্থগিতের সিদ্ধান্তে যুক্তরাজ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়া বা ‘ব্রেক্সিট’ নিয়ে আলোচনার মধ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন প্রায় পাঁচ সপ্তাহের জন্য পার্লামেন্ট স্থগিত রাখার আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মাঠে নেমেছে বিরোধীরা। রাজনৈতিক মহল বাদেও সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে ‘বিতর্কিত’ উল্লেখ করে তা বাতিলের দাবিতে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ, গণস্বাক্ষর অভিযান ও আইনি লড়াই। ফলে আগের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের পদত্যাগের পরেও নতুন দায়িত্ব নেওয়া বরিসের সরকার একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত পার্লামেন্টের অধিবেশন স্থগিত করার জন্য রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী বরিস। বুধবার সেই অনুরোধ পাওয়ার পরপরই রানি তা অনুমোদন করেন।

বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদ কার্যকরের যে কৌশল নিয়েছে, তাতে পার্লামেন্ট যাতে বাধা দিতে না পারে, সে জন্য এ পদক্ষেপ। এ সিদ্ধান্ত ব্রেক্সিট বিষয়ে আইনপ্রণেতাদের পার্লামেন্টে বিতর্ক এবং মতামত দেওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করবে বলে তাদের অভিমত। বিরোধী লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন এ সিদ্ধান্তকে ‘গণতন্ত্রের ওপর ধাক্কা’ বলে বর্ণনা করেছেন। এমপিদের পার্লামেন্টে আইন পাশ করার যথেষ্ট সময় না দিয়ে চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিটের দিকে ঠেলে দিতেই এটি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। স্কটল্যান্ডের ফাস্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টার্জন বলেছেন, এই পরিকল্পনা ঠেকাতে আগামী সপ্তাহে এমপিদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, তা না হলে ইতিহাসে আজকের দিনটি যুক্তরাজ্যের গণতন্ত্রের জন্য অন্ধকার দিন হিসেবে চিহ্নিত হবে। এদিকে, সরকারদলীয় (টোরি) সাবেক চ্যান্সেলর ফিলিপ হ্যামন্ড একে ‘অত্যন্ত অগণতান্ত্রিক’ বলে অভিহিত করেছেন। 

তবে সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন, ব্রেক্সিট নিয়ে আলোচনার যথেষ্ট সময় পাবে পার্লামেন্ট। আগামী ৩১ অক্টোবর ইইউর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ ঘটবে বলে দিনক্ষণ নির্ধারিত রয়েছে। বিরোধীরা চুক্তি ছাড়া বিচ্ছেদে নারাজ। তারা আবারও সময় পেছাতে চান। তবে কট্টর ব্রেক্সিটপন্থি বরিসের সরকার বলছে, বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট জল ঘোলা হয়েছে। তার সরকার আর সময় পেছাতে রাজি নয়।

পার্লামেন্ট স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানাজানি হওয়ার পর থেকেই ওয়েস্টমিনস্টারের পার্লামেন্ট চত্বর ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বুধবার জড়ো হতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা। ব্রেক্সিটবিরোধী শত শত বিক্ষোভকারী মধ্যরাত পর্যন্ত রাস্তায় অবস্থান করে মুহুর্মুহু স্লোগানে গোটা এলাকা প্রকম্পিত করে তোলেন। দেশের বিভিন্ন শহরেও একই রকম বিক্ষোভ হয়। আগামীকাল শনি ও পরদিন রবিবার আরো বড়ো ধরনের বিক্ষোভের পরিকল্পনা করেছে ব্রেক্সিটবিরোধীরা।

গণস্বাক্ষর :পার্লামেন্ট স্থগিতের সিদ্ধান্ত বাতিলের আহ্বান জানিয়ে সরকারি ওয়েবসাইটে চালু করা এক পিটিশনে স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ১৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। রীতি অনুযায়ী কোনো পিটিশনে ১ লাখ স্বাক্ষর পড়লে সেটি নিয়ে পার্লামেন্টে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া সরকারের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার (জুডিশিয়াল রিভিউ) আবেদন করেছেন ব্রেক্সিটবিরোধী প্রচারক জিনা মিলার। ২০১৭ সালে বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানোর বিষয়ে পার্লামেন্টের মতামত গ্রহণে সরকারকে আদালতে তুলে তিনি সফল হয়েছিলেন।

এদিকে, সংসদীয় বিশেষজ্ঞ হ্যানসার্ড সোসাইটির পরিচালক রুথ ফক্স বিবিসিকে বলেছেন, ব্রেক্সিট নিয়ে চলমান উত্তপ্ত সময়ে দলীয় সম্মেলনের জন্য আইনপ্রণেতারা কত দিন ছুটি নিতেন কিংবা আদৌ অধিবেশন বন্ধ করতেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত তারা নিজেরা নিতেন। এ ছাড়া নতুন অধিবেশন শুরুর প্রস্তুতির জন্য পার্লামেন্ট কয়েক দিন স্থগিত রাখার রীতি আছে। কিন্তু সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনায় এবারের ঘটনা তাত্পর্যপূর্ণ।

পক্ষে সমর্থন কম :বুধবার ইউগোভ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটেনের ৪৭ শতাংশ লোক সরকারের সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মনে করে। এই সিদ্ধান্তের পক্ষে মত দিয়েছেন মাত্র ২৭ শতাংশ লোক । তবে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দেওয়া ৫১ শতাংশ এবং ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির ৫২ শতাংশ লোক সরকারের সিদ্ধান্তের সমর্থক বলে জরিপে উঠে এসেছে।

বিবিসির রাজনীতিবিষয়ক সম্পাদক লরা কুয়েন্সবার্গ বলছেন, সরকার জেনে-বুঝেই এমন ঝুঁকি নিয়েছে। কেননা, টিকে থাকার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা এ সরকারের নেই। তাই আরেকটি সাধারণ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। পার্লামেন্ট স্থগিতের সিদ্ধান্ত সেই নির্বাচনের জন্য সহায়ক হবে বলে মনে করছে সরকার।