লাঠিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে ছেলেটি সড়কের এক পাশ দিয়ে। পরনে স্কুল ড্রেস। কাঁধে ঝুলানো স্কুলব্যাগ। গন্তব্য বিদ্যালয়। লাঠিতে ভর দিয়ে খুব কষ্টে চলছে বিদ্যালয়ের পথে। দু একবার মাটিতে পড়েও গিয়েছে। কিন্তু তবুও চলা থামেনি। বুধবার সকালে প্রতিবন্ধী এক শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় যাত্রার এই দৃশ্য দেখা যায় গৌরীপুর পৌর শহরের গোলকপুর এলাকায়।
তার নাম রমন চৌহান। সে গোলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না। লাঠিতে ভর দিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। রমনের বাড়ি পৌর শহরের ৯নং ওয়ার্ডের গোলকপুরে। বাবা শঙ্কর চৌহান। মা পতুল চৌহান গৃহিনী। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে রমন সবার বড়। রমন ও তার পরিবারের সঙ্গে কথা হয় তাদের বাড়িতে। কথাবার্তায় জড়তার কারণে প্রশ্ন করলে স্পষ্ট উত্তর দিতো পারতো না রমন। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো।
পুতুল চৌহান বলেন, প্রতিবন্ধী হওয়ায় রমন ছোটবেলায় হাঁটতে পারতো না। উঠানে বসে থাকতো। বড় হওয়ার পর সমবয়সীদের স্কুলে যাওয়া দেখে সে বায়না ধরে স্কুলে যাবে। পরে স্কুলে ভর্তি করে দেই। শুরুর দিকে আমি রমনকে স্কুলে আনা-নেওয়া করতাম। কিছুদিন পর ও নিজেই লাঠিতে ভর দিয়ে স্কুলে আসা যাওয়া শুরু করে। জন্মের সময় রমনের পা দুটো বাঁকা ও সরু ছিলো। অভাবের জন্য চিকিৎসা না হওয়ায় ওর পা দুটো অচল হতে থাকে। মুখের কথাবার্তায়ও চলে আসে জড়তা। ছোটবেলায় হামগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে লাঠিতে ভর দেয়া শিখে। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া-আসা করলেও অভাবের তাড়নায় প্রাইভেট পড়া হয় না রমনের। প্রতিবন্ধী হলেও ভাগ্যে জোটেনি সরকারি ভাতা।
বাড়ির সামনেই রমনের বাবার ছোট্ট দোকান। সারাদিনে ২ থেকে ৩শ টাকা বিক্রি হয়। আয়ের ওই টাকা দিয়েই টানাটানি করে চলে সংসার। তাই রমনকে একটা প্রাইভেট পড়ানো কিংবা ভালো কাপড় কিনে দিতে পারেন না।
রমনের বাড়িতে কথা বলতে বলতে এক সময় আসেন বাবা শঙ্কর চৌহানের। তিনি বলেন, আমি গরিব মানুষ। ছেলের পড়াশোনার খরচ দিতে পারি না। জনপ্রতিনিধিরাও ছেলেকে ভাতার কার্ড দেয়নি। এর চেয়ে কষ্ট আর কি আছে।
স্বামীর কথা থামিয়ে দিয়ে স্ত্রী পুতুল চৌহান বলেন, যত কষ্টই হোক, ছেলেকে পড়াশোনা করাতে হবে। কথাটুকু বলতে গিয়ে রমনকে বুকে টেনে তিনি আদর করে জানতে চান, বড় হয়ে কি হবিরে বাবা? উত্তর দেয় না রমন। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
আরও পড়ুন: ভূরুঙ্গামারীতে ৭ম শ্রেণির ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়ে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা
ফিরতি পথে গোলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলে কথা হয় প্রধান শিক্ষক প্যাসিফ্লোরা সুলতানার সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী হলেও রমন স্কুলে নিয়মিত। সবার সহযোগিতা পেলে সে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডেও কাউন্সিলর আলী আহাম্মদ বলেন, পরিবারের লোকজন যোগাযোগ করলে রমনের প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড প্রাপ্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ইত্তেফাক/আরকেজি