ব্রেক্সিট লইয়া যুক্তরাজ্য এমন এক কানাগলিতে প্রবেশ করিয়াছে, যেইখান হইতে বাহির হইবার পথ যেন রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হইতে ব্রিটেনকে বাহির হইতে হইবেই—এমন এক বাধ্যবাধকতার জালে আটকাইয়া এখন ব্রিটেনের গণতন্ত্রই প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়া পড়িয়াছে। যুক্তরাজ্যের সবগুলি বিরোধী দল যাহার পর নাই ক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছে বিশেষ করিয়া প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের উপর, যিনি ব্রিটিশ রানির অনুমোদনক্রমে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সের অধিবেশন স্থগিত করিয়াছেন। ইহা তিনি পারেন। যুক্তরাজ্যের প্রথা-বিধি অনুযায়ী তাহার অধিকার রহিয়াছে। কিন্তু ব্রিটেনের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই ক্ষমতা ব্যবহারের নজির নাই। ইহা প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের গায়ের জোর খাটাইয়া ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের পরিকল্পনা বলিয়া মনে করিতেছেন অনেক রাজনীতিবিদ। প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টি নেতা জেরেমি করবিন এই সিদ্ধান্তকে সংবিধানের (যদিও ব্রিটেনে কোনো লিখিত সংবিধান নাই) চরম লঙ্ঘন বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। লেবার দলের আরেক নেতা জন ম্যানডেনেল এই সিদ্ধান্তকে ‘গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান’ বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। জেরেমি করবিন আগামী মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী জনসনকে চ্যালেঞ্জ করিবেন বলিয়া ঘোষণা দিয়াছেন। এমনকি বরিস জনসনের রক্ষণশীল দলের স্কটল্যান্ডের নেতা রুথ ডেভিডসন বরিসের এই সিদ্ধান্তের পর পদত্যাগ করিয়াছেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি বলিয়াছেন তাহার পরিবারকে সময় দিতে চাহেন, কিন্তু কেহই তাহা বিশ্বাস করিতেছে না। তিনি বরিস জনসনের প্রধানমন্ত্রিত্বের মনোনয়নের সময় হইতেই বিরোধী ছিলেন। তবে সরাসরি বরিস জনসনকে অভিযোগ করিয়া পদত্যাগ করিয়াছেন রক্ষণশীল দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং ডেভিড ক্যামেরন সরকারের হাউজ অব কমন্সের নেতা জর্জ ইয়ুং। অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার বা সরকার প্রধান নিকোলা স্টার্জন প্রধানমন্ত্রীর পার্লামেন্ট স্থগিতকে ‘নিম্নশ্রেণির একনায়কত্ব’ বলিয়া পুনর্নির্বাচনের আহ্বান জানাইয়াছেন। ব্রিটেনের রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকাররা প্রায় সকলেই বলিতেছেন গণতন্ত্রের অন্যতম প্রবক্তা যুক্তরাজ্য বরিস জনসনের হাতে বর্বর যুগে ফিরিয়া গিয়াছে, দেশটি এখন তৃতীয় বিশ্বের তথাকথিত গণতন্ত্রের পথে হাঁটিতেছে। ইতিমধ্যেই অনলাইনে ১৪ লক্ষ লোক স্বাক্ষর করিয়া আবেদন জানাইয়াছে এই স্থগিত আদেশ তুলিয়া লইবার। প্রকাশ, ১০ সেপ্টেম্বর হইতে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত অধিবেশন স্থগিত থাকিবে এবং ১৪ অক্টোবর রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ভাষণ দিবেন।
মুদ্রার অন্যপিঠের দিকে তাকাইলে দেখা যাইবে বরিস জনসনের হাতেও বিকল্প কিছু নাই। তাহার পূর্বসূরি থেরেসা মে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হইতে দুই দফায় (৬+১) সাত মাস সময় বাড়াইয়াছিলেন এবং একটি নমনীয় সমঝোতায় আসিতে চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানরা তাহার সেই উদ্যোগ দুই দফা নাকচ করিয়া দিলে তিনি পদত্যাগ করিতে বাধ্য হন। উল্লেখ্য, বরিস জনসন নো ডিল ব্রেক্সিটের অন্যতম সমর্থক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য ও সীমান্ত বিষয়ে নূতন কোনো চুক্তিতে না গিয়া ব্রেক্সিট কার্যকর করিবার প্রক্রিয়াকে ব্রিটিশ এমপিরা যাহাতে বাধাগ্রস্ত না করিতে পারে উহা ঠেকাইতেই তিনি এই অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করিয়াছেন।
উল্লেখ করিতে হয়, ২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হইতে বাহির হইয়া যাওয়ার পক্ষে ব্রিটিশ জনগণের রায়ের পর কথা ছিল, দুই বত্সর, অর্থাত্ ১৯ মার্চ ২০১৯ সালের মধ্যে ব্রিটেন একটি সমঝোতার মধ্য দিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন হইতে বাহির হইয়া যাইবে। কিন্তু তাহা সম্ভব হয় নাই। ব্রেক্সিট প্রশ্নে রক্ষণশীল দলেরই দুজন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামরন এবং থেরেসা মে-কে পদত্যাগ করিতে হইয়াছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, মাত্র ১৭ দিন সময় হাতে লইয়া যুক্তরাজ্যকে চুক্তি ছাড়াই ইউরোপীয় ইউনিয়ন হইতে বাহির হইতে হইবে। আর তাহা যে ব্রিটিশ অর্থনীতিকে ভয়ানক ঝুঁকির মধ্যে ফেলিবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকিয়া যাওয়া ব্রিটেনের অংশ উত্তর আয়াল্যান্ডের সীমান্ত লইয়াও কোনো সুরাহা হয় নাই। এই সবকিছু মিলাইয়া আরো গভীরে নিপতিত সংকট বরিস জনসন কীভাবে মোকাবিলা করেন তাহা জানিতে আগামী কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করিতে হইবে।