শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে ‘আঁচল মা’

মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ

বছর দুই আগের কথা। পটুয়াখালীর কলাপাড়া মনোহরপুর এলাকার বাসিন্দা জোনাকি বেগম ও আলমগীর হোসেন দম্পতির একমাত্র কন্যা টুনটুনি। কোনো এক ঈদের দিনের ঘটনা। মা সকালেই মেয়েকে গোসল করিয়ে নতুন জামা-স্যান্ডেল পরিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে দেয়। বর্ষাকাল হওয়ায় টুনটুনি উঠোন, এ ঘর-সে ঘর করায় তার নতুন স্যান্ডেল ও পায়ে কাদা লেগে যায়। পাঁচ বছর বয়সি ছোট্ট টুনটুনি মায়ের কাছে এসে বায়না ধরে ‘পায়ে কাদা লেগেছে, ধুইয়ে দাও’। মা জোনাকি কাজে ব্যস্ত থাকায় মেয়েকে একটু অপেক্ষা করতে বলে। কিন্তু অবুঝ টুনটুনি কান্না শুরু করে দেয়। এরিমধ্যে মা কাজ গুছিয়ে এসে টুনটুনিকে না দেখতে পেয়ে ডাকতে শুরু করে। এরপর আশপাশ খুঁজে দেখে টুনটুনি কোথাও নেই। মা জোনাকির মাথায় আসে -মেয়ে পায়ে লাগা কাদা পরিষ্কার করে দিতে বলেছিল। উঠোনের পাশেই ঘরের সাথে লাগোয়া পুকুরে নামার কথা মনে পড়ে তার। বাসার সবাই তখন গেছে ঈদের নামাজ পড়তে। মা জোনাকি নিজেই লাফ দিয়ে পানিতে নামে। সামনে পা বাড়াতেই মেয়ের শরীর লাগে পায়ে। দ্রুত তুলে আনে, কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না আর। টুনটুনি ততক্ষণে পাড়ি জামিয়েছে না ফেরার দেশে। এতো গেল টুনটুনির কথা। এ ধরনের হাজার ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে। কারণ সকাল ৭টা থেকে দুপুর দেড়টা-দুইটা পর্যন্ত গ্রামীণ নারীরা ব্যস্ত থাকেন সংসারের কাজে। আর এ সময়টাতেই ঘটে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা। এই পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে দেশে কাজ করছে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ ( সিআইপিআরবি)। প্রতিষ্ঠানটি ‘ভাসা’ প্রকল্পের আওতায় আঁচল মা সুইমসেফ, স্কুল ওয়াটার সেফটিসহ বেশ ক’টি কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

‘আঁচল’ একটি ছোট্ট ঘর। ঘরের মেঝেতে মাদুর বিছানো। সেই ঘরের চার দেয়ালে শিশুদের কচি হাতে আঁকা ফুল-পাখি-গাছসহ নানা আঁকিবুকি। ঘরে একঝাঁক শিশুর আনন্দে সময় কাটানোর ব্যবস্থা। কেউ খেলছে, কেউ বা আঁচল মায়ের কোলে উঠে বসে আছে, কেউ কলকাকলির ভেতরেই ঘুমিয়ে পড়েছে। এভাবেই নিরাপদে বেড়ে উঠছে গ্রামীণ শিশুরা। এই আঁচলে এক বছর থেকে ৫ বছর পর্যন্ত শিশুদের রাখা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, সকাল ৭টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত পরিবারের কাজে ব্যস্ত থাকেন গ্রামের নারীরা। এই সময়ে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। এই বিষয়টি মাথায় রেখে গ্রামীণ শিশুদের সকাল ৭টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত ‘আচল মা’ -এ রাখা হয়। এটি শিশুদের দিবাযত্ন কেন্দ্রের মতোই একটি সেন্টার। এখানে শিশুরা একসঙ্গে খেলবে, শিশুর মানসিক বিকাশে নাচ-গান, রং চেনা, গল্প বলা ও কবিতা আবৃত্তি শোখানো হয়। শিশুকে এই সময় ধরে রাখতে তাদের বিনোদনে যাবতীয় ব্যবস্থা থাকে সেখানে। একটি আঁচলে ২৫ থেকে ৩০ জন বাচ্চা থাকতে পারে। সেখানে একজন ‘আঁচল মা ও তার একজন সহযোগী থাকেন।

আঁচল মা শিপরা রানী বলেন, আমার ‘আঁচলে পঁচিশজন শিশু থাকে। এদের আমরা টিফিন দিতে পারি না। এরা নিজেরা বাড়ি থেকে টিফিন আনে। তবে আমরা শিশুদের টিফিন বক্স দিয়ে থাকি। এই শিশুরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই আঁচলে থাকার সুযোগ পায়। সপ্তাহে কেবল শুক্রবার বন্ধ থাকে। আঁচল মা সাথী বলেন, আমি দুই বছর ধরে কাজ করছি । শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক বিকাশে আমরা সহযোগিতা করি। এ ধরনের ডে কেয়ার সেন্টার বা দিবাযত্ন কেন্দ্র সমাজে আরো থাকা দরকার।

সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের উপ নিবার্হী পরিচালক ড. আমিনুর রহমান বলেন, শিক্ষার হার বাড়লে সচেতনতা বাড়বে, এতে পানিতে ডোবার হার কমে যাবে। তবে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে এখনো জাতীয় কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে যেসব শিশু আঁচলে থাকে তাদের পানিতে ডুবে মৃত্যু এবং অন্যান্য যে কোনো ইনজুরিতে মৃত্যুর ঝুঁকি ৮০ ভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর সাঁতার শিখিয়ে শতকরা ৯৫ ভাগ পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে জানান তিনি।