প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিকে খুনিদের দল হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান দেশে সর্বপ্রথম গুম-খুনের রাজনীতি শুরু করেছিলেন। আওয়ামী লীগের অগণিত নেতাকর্মীকে জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন করেছে, লাশ গুম করে দিয়েছে। শুধু আমাদের দলের লোকদের হত্যা করা হয়েছিল এমন নয়, যারা মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ছিলেন, সেনাবাহিনী-বিমানবাহিনীতে যারা জাতির পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, সেরকম শত শত অফিসার ও মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিল খুনি জিয়াউর রহমান। হাজার হাজার সৈনিককে দিনের পর দিন ফাঁসি দিয়ে, গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। শোনা যেত খাবার টেবিলে বসে জিয়া এক হাতে কাটা চামুচে খেতেন, অন্য হাতে মৃত্যুদণ্ডের ফাইলে সই করতেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ যেন আর কখনো সেই হায়েনাদের হাতে না পড়ে। একজন অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী খুনির হাতে তৈরি রাজনৈতিক দল খুনি ছাড়া আর কি হতে পারে? বাংলাদেশ যে আজ উন্নয়নের মহাসড়ক দিয়ে যাচ্ছে, দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির ধারা যেন আর থমকে না দাঁড়ায়। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে অনেক প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। এ জন্য দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে বিএনপি নেতারা এখন নতুন সাফাই গাইতে শুরু করেছে’ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেতারা এখন বলছে, ’৭৫ সালে তো বিএনপি গঠনই হয়নি, তাহলে বঙ্গবন্ধু হত্যায় বিএনপি কীভাবে জড়িত? বিএনপি নেতাদের এমন বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির যে প্রতিষ্ঠাতা, সেই জিয়াউর রহমান নিজেই খুনি। জিয়াউর রহমান শুধু সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর খুনের জড়িত ছিল না, এই হত্যার যাতে বিচার না হয় সেই ব্যবস্থাও সে করেছিল। ইনডেমনিটি ছাড়াও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল সেসব আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃতি করেছিল। আওয়ামী লীগের যারা বেইমান-মোনাফেক খুনি মোশতাকের সঙ্গে গিয়েছিল, তারা কোনো না কোনোভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের চক্রান্তে ছিল। যারাই মোশতাকের সঙ্গে ছিল তারা খুনের সঙ্গে জড়িত। পরবর্তীতে তারা জিয়ার সঙ্গে গিয়েছিলেন। এখনো তাদের অনেকে বেঁচে আছে, তারা আবার বড়ো বড়ো কথাও বলে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেনারেল জিয়া একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী-স্বাধীনতাবিরোধী এম এ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী ও যুদ্ধাপরাধী আলীম, মাওলানা মান্নানদের মন্ত্রী করে তাদের হাতে লাখো শহিদের রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তুুলে দেয়। তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও একই পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজাকার-আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেন। ১৫ আগস্ট ভোটারবিহীন নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি রশিদ ও হুদাকে এমপি বানায়, এমনকি রশিদকে বিরোধী দলের আসনে বসিয়ে সংসদের পবিত্রতা নষ্ট করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, যারা খুনের সঙ্গে জড়িত, আত্মস্বীকৃত খুনিদের মদদ ও পুরস্কৃত করে, একাত্তরের গণহত্যাকারীদের মন্ত্রী বানায় সেই দল বিএনপি খুনিদের দল নয়, এটা বলে কীভাবে?
শেখ হাসিনা বলেন, আজকে বাংলাদেশ আর্থ সামাজিকভাবে উন্নত হচ্ছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। শুধু এটুকু মনে হয়, ৪৪ বছর পর আমার বাবা ও মায়ের আত্মা শান্তি পাবে এই দেখে যে, দেশের মানুষ আর ক্ষুধার জ্বালায় কাতর হয় না। রোগে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায় না। লেখাপড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা যে লক্ষ্যগুলো স্থির করেছি, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবো। এই শোক ব্যথা বুকে নিয়ে এগিয়ে যাবো। একই দিনে আমরা সবাইকে হারিয়ে শোক নিয়েও আমরা দুটো বোন কাজ করছি। দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে কাজ করছি। দেশের মানুষ ভালো থাকলে জাতির পিতার আত্মা শান্তি পাবে। আমরা শুধু বাবা মা হারিয়েছি তা নয়, দেশের মানুষ হারিয়েছিল সব সম্ভাবনা। আমরা সেই সম্ভাবনা আবার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তরের পর ১৯টা শুধু ক্যু-ই হয়েছে। সেনাবাহিনী-বিমানবাহিনীর শত শত অফিসারকে হত্যা করেছিল। শুধু তাই না, সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সৈনিককে হত্যা করা হয়েছিল। অনেকে হয়তো ছুটিতে থেকে জয়েন করেছে তাদের ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অনেকে হয়তো জানতেও পারেনি তাদের কেন হত্যা করা হচ্ছে, ডিফেন্ড করার সুযোগ দেওয়া হয়নি; গুলি করে হত্যা করেছে-ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঐ সময়ে যারা কয়েদি ছিল তারা বলতে পারবে এক-এক রাতে ৮ জন ১০ জন করে জোড়ায় জোড়ায় ফাঁসি দিয়েছে। তাদের কান্নায় চিত্কারে আকাশ ভারি হয়ে উঠতো। বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ সব দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের আরো কাজ করতে হবে, দেশকে আরো এগিয়ে নিতে হবে, উন্নতি করতে হবে।
ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমত উল্লাহ’র সভাপতিত্বে আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাহারা খাতুন, দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, বিএম মোজাম্মেল হক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য এসএম কামাল হোসেন, মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসনাত, মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, দক্ষিণের সহ-সভাপতি আবু হানেফ মান্নাফী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল চৌধুরী, উত্তরের সহ-সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এসএ মান্নান কচি প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের প্রচার সম্পাদক আকতারুজ্জামান ও উত্তরের উপ প্রচার সম্পাদক আজিজুল হক রানা।