ক্রেডিট কার্ডের যুগ এখন। পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ঘুরে আসতে পারেন পকেটে কোনো টাকা না নিয়েই। এমনকি আপনার ব্যাংকে কোনো টাকা না থাকলেও সেরে ফেলতে পারেন বাজার-সদাই, সন্তানের স্কুলের ফি ও বাড়িভাড়া দেওয়া। সেই টাকা পরে দিলেও চলবে। দুনিয়াটা যখন এ অবস্থায় চলে এসেছে, তখন ‘সঞ্চয়ের’ প্রয়োজনীয়তা অনেকের কাছেই গুরুত্ব হারিয়েছে। তাছাড়া এখন তো মুক্তবাজার অর্থনীতির কাল। ফলে খরচ করাকেই উত্সাহিত করা হয়। মানুষকে আগ্রহী করা হয় ভোগের প্রতি। আর সে কারণেই সঞ্চয় করাকে নিরুসাহিত করা হয়। তারা মনে করেন, সঞ্চয় কি সত্যিই খুব জরুরি? তবে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে সফল মার্কিন উদ্যোক্তা ওয়ারেন বাফেট বলছেন, খরচের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা সঞ্চয় না করে বরং সঞ্চয়ের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা খরচ করুন। কিন্তু কেন তিনি এ কথা বলছেন? সঞ্চয় কি আসলেই জরুরি?
বিপদের বন্ধু সঞ্চয়। আর্থিক সচ্ছলতার ভাবনা একেকজনের কাছে একেক রকম। কেউ মনে করেন তিন বেলা অন্ন জোটানোই সচ্ছলতা। কারো কাছে সংসারের যাবতীয় খরচ মিটিয়ে ভালোভাবে জীবনযাপনই সচ্ছলতা। তবে বৈশ্বিকভাবে সচ্ছলতার মানদণ্ড হচ্ছে, আপনি যদি মাস শেষে চাকরির চেকের ওপরই কেবল নির্ভরশীল না হন, তাহলে আপনাকে সচ্ছল বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। তারপরও একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট ক্রয়, চিকিত্সা খরচ মেটানো, ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষা, বিয়ে এবং বেড়ানোর মতো যথেষ্ট টাকা যদি না থাকে, তবে এখনই শুরু করুন সঞ্চয়। একটি বাড়ি কিনুন বা গাড়ি ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার টাকা যদি না থাকে, তবে সঞ্চয়ের গুরুত্বের শেষ নেই।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সঞ্চয়ের পরিধি ও বিনিয়োগের পরিধি একই। কেননা, বিনিয়োগের অর্থ আসে সঞ্চয় থেকে। মানুষ বেশি বেশি সঞ্চয় করলে ব্যাংকগুলো সেই টাকা বেশি বেশি প্রতিষ্ঠানে লগ্নি করতে পারে। বাংলাদেশের মানুষকে তাদের সঞ্চয়ের জন্য মূলত ব্যাংক এবং অন্যান্য নন-ব্যাংকিং আর্থিক সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। ব্যাংকগুলোও তাদের গ্রাহকেরা যেন জীবনের প্রতিটি পর্যায়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেন, সেটিকে পরিকল্পনা করেই নতুন নতুন সঞ্চয়ী হিসাবের প্রস্তাব সামনে নিয়ে আসছে।
প্রতিদিন অল্প অল্প সঞ্চয় করুন
অল্প করে হলেও সঞ্চয় শুরু করুন। এই কাজ শুরু করতে পারেন মাটির ব্যাংক দিয়ে। প্রতিদিন মাটির ব্যাংকে অল্প করে টাকা রাখুন। একসময় দেখবেন এই জমানো টাকা একটি বিশাল অঙ্কে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়িয়ে চলুন। সহজে টাকা জমানোর একটি উপায় হলো বাইরে খাওয়া কমিয়ে দেওয়া। বাইরে খাওয়া বন্ধ করে টাকা জমান। সপ্তাহের একটি দিন ঠিক করুন, সেদিন কোনো খরচ করবেন না। দেখবেন খরচ অনেকখানি কমে গেছে। কত টাকা জমাতে চান, সেই হিসাব করে বাজেট করুন। প্রতি সপ্তাহে কী কী খরচ আছে, পরিকল্পনা করে সে অনুযায়ী টাকা খরচ করুন। পরিকল্পনার বাইরে খরচ না করার চেষ্টা করুন। একটু টাইট বাজেট করুন, এতে টাকা সঞ্চয় করা সহজ হবে। আমরা অনেক সময় এমন কিছু জিনিস কিনে থাকি, যা আসলে আমাদের প্রয়োজন নেই। এসব জিনিস শুধু ঘরের জঞ্জাল বাড়ায়। দরকারি জিনিস ছাড়া অপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করে দিন। সেই সঙ্গে পরিকল্পনা করুন, আপনার বড়ো বড়ো পরিকল্পনার জন্য কত টাকা প্রয়োজন।
টাকার প্রচলন ও সঞ্চয়ের ইতিহাস
গ্রামে টিনের কৌটায় টাকা রাখতেন বাড়ির মেয়েরা। ঘরের দাওয়ায় বাঁশের খুঁটি ফুটো করে সেখানে টাকা গুঁজে রাখার চলও অনেক পুরোনো। ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা পেতে জমানো টাকা টিনের ট্রাংকে করে ঘরের মধ্যে মাটির নিচে পুঁতে রাখার কথাও আমার শুনেছি। কিন্তু দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে সঞ্চয়ের ধারণা। মানুষ এখন টাকা জমায় ব্যাংকে। রয়েছে সঞ্চয়ের নানা রকমের স্কিম। বাংলাদেশে সঞ্চয়ের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে ‘সঞ্চয়পত্র’ কেনা। এছাড়া ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিটও বহুল জনপ্রিয়।
বিশ্বে ব্যাংকিংব্যবস্থা খুব প্রাচীন নয়। তবে মুদ্রার ব্যবহার শুরু হয়েছে বহুকাল আগে। খ্রিষ্টপূর্ব ১২ হাজার বছর আগে সেই প্রস্তর যুগে মুদ্রার প্রচলন শুরু। খ্রিষ্টপূর্ব ১ হাজার বছর আগে চীনে প্রথম ব্রোঞ্জের মুদ্রার প্রচলন হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ থেকে ৫০০ বছর আগে ভারত, চীন ও আজিয়ান সাগরের আশপাশের দেশগুলোতে রীতিমতো মুদ্রা উত্পাদন করা হতো। চীনের ‘সং ডাইনেস্টি’ কাগজের নোট চালু করে। ‘ট্যাং ডাইনেস্টি’ সপ্তম শতকে এসে ব্যাংক নোটে রূপান্তর করা হয়। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে জোহান পামস্ট্রাচের উদ্যোগে সুইডেনে ১৬৫২ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ব্যাংক নোট চালু হয় এবং ১৬৬১ সালের দিক থেকে এর প্রচলন বাড়তে থাকে। তবে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ১৬৯৪ সালে প্রথম স্থায়ী নোট চালু করে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যাংক নোটই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ব্যাংক নোট।