সিলেটের বিভিন্ন নৌপথে চাঁদাবাজরা র্যাব-পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না। এদের অত্যাচারে নৌযানগুলো অতিষ্ঠ। সিলেটের ভেলাগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জের দুর্লভপুর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজরা সক্রিয়। ৫০০ থেকে ১ হাজার কোনো কোনো স্থানে ২ হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। এভাবে এই রুটে একটি নৌকাকে বৈধ ও অবৈধ চাঁদা খাতে ৩-৪ হাজার টাকা গুনতে হয়।
এই রুটের কয়েকজন বলগেট মালিক বলেন, ‘ব্যাংক ঝণ, হাওলাত করে ২০-৩০ লাখ টাকা পুঁজি খাটিয়ে বলগেট নামিয়েছিলাম বালি-পাথর পরিবহনের জন্য। কিন্তু এখন চাঁদাবাজ চক্রের ভয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার চিন্তা করছি।’
সিলেটের পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা নদী বা বিভিন্ন মহাল থেকে সারা বছর বালি-পাথর আহরণ করে থাকে হাজার হাজার বলগেট, বড়ো বড়ো স্টিমার ও বিভিন্ন আকারের নৌকা। চাঁদাবাজ চক্রের অত্যাচারে এখাতের নৌযানের চলকরা অতিষ্ঠ। সূত্র জানায়, জামালগঞ্জ উপজেলা সদরের ২ কিলোমিটার দূরে দুর্লভপুরের চলতি, সুরমা, রক্তি ও গজারিয়ার নদীতে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চলছে। তারা দিনদুপুরে লাখ টাকা চাঁদা হাতিয়ে নিচ্ছে। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, চাঁদাবাজির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রমাণ পেলে চাঁদাবাজদের ছাড় নেই।
সূত্র মতে, চলতি বছর ৩০ মে পর্যন্ত উপজেলা পরিষদ থেকে রুবেল মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে টেন্ডারের মাধ্যমে দুর্লভপুর খেয়াঘাট ইজারা দেয়া হয়। ইজারার শর্তে বলা আছে, শুধু ঘাটে মালামাল উঠানামা ও নৌযান নোঙর করা হলে নৌযান প্রতি ৫০ টাকা করে টোল আদায় করা যাবে। কিন্তু মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ধূম্রজাল সৃষ্টির মাধ্যমে চলতি, সুরমা ও রক্তি নদীতে যাওয়া-আসায় লোড-আনলোড নৌযান থেকে ৫০০ থেকে ১ হাজার ও রক্তি নদীতে প্রবেশ করলে ২ হাজার টাকা আদায় করছে তারা। এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ঐ চক্র। কয়লা, বালিপাথর, চুনাপাথর বহনকারী বলগেট, স্টিল বডি নৌকা, সারা দেশে মালামাল যোগান দেয়। কিন্তু যাতায়াতের সময় নৌযানগুলোকে আটকিয়ে দুর্লভপুর-গজারিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করে সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্রটি। প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ শতাধিক নৌযানে চাঁদা আদায় করে তারা। ভুক্তভোগীরা জানান, কথামতো চাঁদা না দিলে বেদম মারপিটসহ প্রাণ নাশের হুমকি দেয় তারা।
সুনামগঞ্জ মালবাহী নৌযান ফেডারেশন লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, এলাকার অসাধু কিছু ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় এমন চাঁদাবজি হচ্ছে। এগুলো বন্ধের দাবিতে তিনি জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
কেন্দ্রীয় বলগেট কার্গো সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চলতি সুরমা ও রক্তি নদীতে যে কোনো ধরনের চাঁদাদাবি বেআইনি। চাঁদার বিষয়ে প্রশাসনকে জানিয়েছি। তিনি জানান, অভিযোগের পর প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কয়েক মাস চাঁদাবাজি বন্ধ ছিল। এখন আবার চাঁদাবাজি বৃদ্ধি পেয়েছে।
চাঁদাবাজির ব্যাপারে দুর্লভপুর ঘাট ইজারাদার রুবেল মিয়া বলেন, সরকারিভাবে আমাকে যেভাবে ইজারার নিয়ম করে দিয়েছে আমি সেভাবে টোল আদায় করছি। জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা পাল বলেন, দুর্লভপুর খেয়াঘাটে চাঁদাবাজির বিষয়টি শুনেছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইদানীং ভোলাগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জের ভাটি পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে আবারও চাঁদাবাজরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে । গত ২৪ আগস্ট র্যাব-৯ পৃথক অভিযান চালিয়ে সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া এলাকার সুরমা নদীর সাহেববাড়ী খেয়াঘাট থেকে চাঁদার ১৬ হাজার টাকা ও একটি কাঠের নৌকাসহ দুজনকে আটক করে। এলাকাবাসী মনে করে, এসব চাঁদাবাজি স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সম্পৃক্ত করে ও গোপন তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এলাকার থানা-পুলিশের মদদে নৌপথে চাঁদাবাজি হচ্ছে কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থেকে ছাতক হয়ে বালি-পাথর নিয়ে নৌযানগুলো বের হলেই কাটা খাল পরে থানা বাজার এলাকায় চাঁদাবাজির শুরু। থানাবাজারে চাঁদা না দিলে নৌযানের সুকানীসহ অন্যদের রশি দিয়ে বেঁধে পিটুনি দেয়। মোবাইল ফোন, টাকাপয়সা কেড়ে নেয়। রাতের আঁধারে থানাবাজার এলাকায় হানা দিয়ে নৌযানের তেল, সোলার লাইট, রশি নিয়ে যায়।