ভাটি অঞ্চল খ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন লোকজ ক্রীড়ার মধ্যে বেশির ভাগই তিতাস নদীকে ঘিরেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এমনই একটি লোকজ ক্রীড়ার নাম নৌকাবাইচ। ঐতিহ্যবাহী তিতাস নদীর পাড়ে এমনই একটি আয়োজনে উৎসবে মেতে উঠেছিল শহর ও এর আশপাশ এলাকার হাজার হাজার মানুষ।
আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ যখন হারিয়ে যাওয়ার পথে ঠিক তখনই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের সহায়তায় তিতাস নদীতে হয়ে গেল নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। প্রচার-প্রচারণার কোন কমতি ছিলনা। মাইকিং, পোস্টারিং, স্থানীয় ডিশ চ্যানেলের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছিল নৌকা বাইচের অনুষ্ঠান মালা। রবিবার বিকালে জেলার বিভিন্ন এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী কিশোরগঞ্জের নিকলী থেকে মোট ১৩টি দল তাদের সুসজ্জিত নৌকা আর রং বে-রঙ্গের বাহারি পোশাক পড়ে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে মাঝিদের ভাটিয়ালী গান আর পানিতে বৈঠার ফেলার ছপ ছপ শব্দ যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল তিতাস নদী। উৎসব আমেজে নৌকা বাইচ দেখতে তিতাস পাড়ে ভীড় জমায় জেলার ও আশপাশ উপজেলা এমনকি পার্শ্ববর্তী জেলার নারী-পুরুষ শিশু বৃদ্ধসহ সর্বস্তরের নীরব নিস্তব্ধ তিতাস পাড় হয়ে উঠে হাজার হাজার মানুষের কোলাহলে মুখরিত। এ নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে শহরে দুপুরের পর গুটি কয়েক রিকশা ছাড়া আর কোন যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়নি। মূলত শহর ফাঁকা হয়ে পড়ে। শহরের পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত তিতাস পাড়ে জমায়েত হয়ে নৌকা বাইচ দেখার জন্য। কেউ কেউ ছোট নৌকা ভাড়া করে পরিবার পরিজন নিয়ে নদীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত পরিমান পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। সে সঙ্গে নৌ-পুলিশ, মেডিকেল টিম এবং ফায়ার সার্ভিসের টিম প্রতিযোগিতার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। সন্ধ্যার ঠিক পূর্ব মুহুর্তে শেষ হয় নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা।
বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে শহরের দক্ষিণ প্রান্তের শিমরাইলকান্দি নদী ঘাট এলাকায় নৌকা বাইচের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক হায়াত উদ দৌলা খান। এসময় পুলিশ সুপার মোঃ আনিসুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার উপস্থিত ছিলেন। প্রায় তিন কিলোমিটার দূরত্বে গিয়ে মেড্ডার কালা গাজির মাজার এলাকায় গিয়ে শেষ হয় নৌকা বাইচ। জেলা প্রশাসন আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রনালয় সর্ম্পকিত সংসদী স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী।
এতে জেলা প্রশাসক হায়াত উদ দৌলা খানের সভাপতিত্বে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর মহাপরিচালক (অব) গ্রেড-১ অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার মোঃ আনিসুর রহমান, বিজয়নগর উপজেলা চেয়ারম্যান মুকাই আলী, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ফিরোজুর রহমান ওলিও, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এতে প্রথম স্থান অধিকারী সরাইল উপজেলার ওসমান উল্লাহর দলকে ১৩ সেফটিক ফ্রিজ ও নগদ ২০ হাজার টাকা, দ্বিতীয় স্থান অধিকারী নাসিরনগরের হরিপুর ইউনিয়নের দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি দলকে ৪০ ইঞ্চি সনি এলইডি টিভি এবং তৃতীয় স্থান অধিকারী নবীনগরের মোর্শেদুল ইসলাম লিটনের দলকে ২০ ইঞ্চি এলইডি টিভি। এছাড়া অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক দলকে নগদ ২০ হাজার টাকা ও একটি ওভেন প্রদান করা হয়।
ইত্তেফাক/আরকেজি