প্রকৃতি বাঁচলে আমরা বাঁচব

জাহিদুল ইসলাম খন্দকার

‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি’ নবজাতকের কাছে যে অঙ্গীকার সুকান্ত ভট্টাচার্য করে গিয়েছিলেন এ বিশ্বকে নিয়ে, সে বিশ্বই আজ পাণ্ডববর্জিত। বিকল্প প্ল্যান থাকতে পারে; কিন্তু বিকল্প পৃথিবী তো আর নেই। অথচ এই পৃথিবীর অবস্থাই আজ জিয়ন্তে মরা। যে পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছি আমরা পৃথিবীর ওপর, পৃথিবী হয়তো অচিরেই মনুষ্য সম্প্রদায়কে অর্ধচন্দ্র দিয়ে তার নিজস্ব বলয় হতে বের করে দিবে।

এইতো কিছুদিন আগেই ভয়ানক বন্যার কবলে পড়লাম আমরা। বন্যার স্রোতে প্লাবিত হলো ২৮টি জেলা। আবাসস্থল, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবই ডুবে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হলো লাখ লাখ মানুষ। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণ কিন্তু আমরাই। যে নদীগুলো এতকাল আমাদের রক্ষাকবচের মতো রক্ষা করে এসেছে, সে নদীগুলোই আজ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। গত চার দশকে ৪০৫টি নদীর মধ্যে ১৭৫টি নদ-নদীই বিলুপ্ত হয়েছে। বাকি ২৩০টি নদীও মারাত্মক ঝুঁকিতে।

নদী বেদখল, বাঁধ আর বর্জ্যের ভাগাড় বানিয়ে প্রকৃতিকে আমরা প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে যাচ্ছি। বর্জ্যের পরিমাণ এতই বেশি যে, বুড়িগঙ্গায় অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বিষাক্ত বাতাসকে স্বাগত জানিয়েই প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে প্রায় ৫ হাজার ৪৭৯ জন শিশু। বাতাসে আজ লাশের গন্ধ নেই, আছে বর্জ্যের গন্ধ। মানব মনের প্রশান্তিদায়ক বৃষ্টির বদলে ঢাকায় হচ্ছে এসিড বৃষ্টি। এ বৃষ্টি গা জুড়ায় না বরং গা পোড়ায়।

যে-বন আমাদের রক্ষা করছে, অবিবেচকের মতো সে বনই আমরা উজাড় করে চলেছি। বাদ পড়েনি পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত মহাবন আমাজনও। আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলছে এই বনটি। পশুপাখি, কীটপতঙ্গ—সবই জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। অথচ পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের ২০ শতাংশই সরবরাহ করে এই বনটি। এই মূর্খ ও স্বার্থপর বিশ্ববাসী কি জানে না বনে আগুন দেওয়ার নামে নিজের গায়েই আগুন দেওয়া হচ্ছে?

কৃষিপ্রধান এই দেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর। এই উর্বর অঞ্চলের ওপর তাই প্রাচীন কাল থেকেই অন্য দেশগুলোর নজর। যুগে যুগে এই বাংলার মাটিকে আমরা রক্ষা করে এসেছি। অথচ নিজের হাতেই এখন নষ্ট করে ফেলছি এই উর্বরাশক্তিকে। অতিরিক্ত কীটনাশক ও সিনথেটিক পণ্যের ব্যবহার এবং মাত্রাতিরিক্ত প্লাস্টিক মাটিতে মিশে এর উর্বরাশক্তি হ্রাস করে ফেলছে।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহূত যাবতীয় পণ্যই প্লাস্টিকের তৈরি। শুধু ঢাকা শহরেই প্রত্যহ ১৪ মিলিয়ন পলিব্যাগ বাইরে ফেলা হয়। আমাদের ড্রেইনেজ সিস্টেমকে ব্লক করে দিচ্ছে এগুলো। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এই জলাবদ্ধতা থেকে জন্ম নিচ্ছে মশা।

পৃথিবীর আর্কটিক অঞ্চলে প্লাস্টিকের অত্যধিক ব্যবহারের দরুন প্লাস্টিক বৃষ্টি হচ্ছে। এক প্রতিবেদন অনুসারে প্রতি এক লিটার তুষারে ১০ হাজারের বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

আমাদের উচিত প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে সোনালি আঁশ পাটকে কাজে লাগানো।  সাম্প্রতিক সময়ে ইকুয়েডরের গুয়াজকিলের জনগণকে প্লাস্টিকের বদলে বাসের টিকিট দেওয়া হচ্ছে। ফলে উত্সাহিত হচ্ছে জনগণ। আমাদেরও উচিত এমন বিচিত্র পদ্ধতি অবলম্বন করে প্রকৃতিকে রক্ষা করা। কারণ প্রকৃতি বাঁচলে আমরা বাঁচব।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।