কোলাহলপূর্ণ পুরান ঢাকার বাংলাবাজার চৌরাস্তা। সেখান থেকে পাটুয়াটুলীর দিকে কয়েক পা এগুলেই ডানপাশে জরাজীর্ণ দালান। ২-৩-৪ লয়েল স্ট্রিট, পাটুয়াটুলী ঠিকানায় লাল রঙের এ দালানটিই ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্মসমাজ মন্দির। সাজানো-গোছানো পরিবেশে। মন্দিরের সামনে বাহারি ফুল এবং পেছনে নানা জাতীয় ফলের বাগান। পাশেই মন্দির পরিচালকদের বসতি। ১৮৭১ সালে ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা, ধর্মালোচনা ও সমাজ সংস্কারমূলক কাজের পাশাপাশি অভয় চন্দ্র দাসের উদ্যোগে একটি পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অভয় চন্দ্র দাস ছিলেন ঢাকার নাট্য আন্দোলনের অন্যতম সূচনাকারী। ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামমোহন রায়ের নামানুসারে পাঠাগারটি ‘রামমোহন গণপাঠাগার’ নামকরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দানে দুর্লভ-দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের সংগ্রহশালা হয়ে ওঠে এটি। তবে একাত্তরে পাক হানাদারবাহিনীর রোষানলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায় বাঙালির অমূল্য সম্পদ এ পাঠাগারটি। সে সময় হানাদারবাহিনী এই পাঠাগারটি থেকে অনেক মূল্যবান বই গায়েব করে ফেলে। তবে জানা যায় এখনো সহস্রাধিক মূল্যবান দুর্লভ বইয়ের সম্ভারে ঠাসা পাঠাগারটি। নেই পাঠক।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাঠাগারটির ভাঙা চৌকাঠে তালা লাগানো। এক পর্যায়ে পরিচয় হলো নিরাপত্তা প্রহরী প্রবীর কুমার পালের সঙ্গে। তার সহায়তায় ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, বই আর আসবাবপত্রের ওপর জমে আছে ধুলাবালির আস্তরণ। তাতে কক্ষটিতে যে বহুদিন কারো পায়ের ছাপ পড়েনি তা বুঝতে মোটেই বেগ পেতে হলো না। অথচ এমন এক সময় গেছে দিন ও রাতের অধিকাংশ সময় নানা বয়সি নানা পেশার পাঠকের পদচারণায় মুখর থাকত গোটা ভবন। আর আজ দেশের প্রথম গণগ্রন্থাগার ‘রাজা রামমোহন রায় পাঠাগার’ অনেকটা পরিত্যক্ত ভবন। নেই পাঠকের আনাগোনা। নেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাঁকডাক।
ব্রাহ্মসমাজের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঐতিহাসিক এই পাঠাগারটিতে এসেছিলেন বাংলা সাহিত্যের দিকপাল ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক গুণীজন। ১৮৯৮ সালে ঢাকায় এসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে তিনটি দর্শনীয় স্থানের কথা বলেছিলেন, এর মধ্যে এই পাঠাগারটিও একটি। সুচিত্রা সেন একবার এই ব্রাহ্মসমাজে এসেছিলেন। সে সময়ের ব্যবহূত বৈদ্যুতিক পাখাটিসহ শত বছরের পুরোনো ঘড়ি, রাজকীয় পালঙ্ক, টি-টেবিল, টেবিল, মুখ দেখার আয়না এখনো কালের সাক্ষী।
পাঠাগারটি সম্পর্কে ঢাকা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আজিম বক্স বলেন, ‘যখন ঢাকা শহরে তেমন বই পাওয়া যেত না তখন আমরা দল বেঁধে যেতাম ব্রাহ্মসমাজের পাঠাগারে পড়তে। বিকালবেলাটা ঐ পাঠাগারেই কাটিয়ে আসতাম। এর আগেও পুরান ঢাকার বাসিন্দারা ব্রাহ্মসমাজের এই পাঠাগারে আড্ডা বসাতো। কবি-সাহিত্যিকরা নিজেদের অবসর সময়ে এখানে আসতেন।
পাঠাগার ও ব্রাহ্মসমাজের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে তিনপুরুষ থেকে ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে জড়িত এবং ব্রাহ্মসমাজের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রণবীর পাল রবি ইত্তেফাককে বলেন, মূল ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আইনি জটিলতায় সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করার কাজ আটকে আছে। সরকারি সহযোগিতা পেলে পাঠাগারটি সম্প্রসারণ করে সেমিনার কক্ষ ও গবেষণা কেন্দ্র বানানোর পরিকল্পনা আছে। সেটি হলে এখানে একটি শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে উঠবে।
পাঠক আসার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এখন আর আগের মতো এই পাঠাগারে পাঠক পড়তে আসে না। তবে মাঝে মাঝে কিছু শিক্ষার্থী একাডেমিক থিসিস করতে আসেন। কখনো কখনো কিছু গবেষকও আসেন গবেষণা কর্মের জন্য। তারা এলে তাত্ক্ষণিকভাবে পাঠাগারটি খুলে দেওয়া হয়। এছাড়া সবসময় বন্ধ থাকে। তবে পাঠাগারটির ভেতরে ঝাড়া-মোছার কাজ নিয়মিত করা হয়।